প্রকাশিত : Sat, Oct 7th, 2017

আলীবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মার জীবনী (ভিডিওসহ)

নিউজ ডেস্কঃ প্রাইমারিতে দুইবার ফেল, মাধ্যমিকে তিনবার ফেল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় তিনবার ফেল, চাকরির জন্য পরীক্ষা দিয়ে ৩০ বার ব্যর্থ হয়েছি আমি। চীনে যখন কেএফসি আসে তখন ২৪ জন চাকরির জন্য আবেদন করে। এর মধ্যে ২৩ জনের চাকরি হয়। শুধুমাত্র একজন বাদ পড়ে, আর সেই ব্যক্তিটি আমি। এমনও দেখা গেছে চাকরির জন্য পাঁচজন আবেদন করেছে তন্মধ্যে চারজনের চাকরি হয়েছে বাদ পড়েছি শুধুই আমি। প্রত্যাখ্যানের পর প্রত্যাখ্যানই দেখেছি আমি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ১০ বার আবেদন করে ১০ বারই প্রত্যাখ্যাত হয়েছি। এতক্ষণ যার কথা বলেছি তিনি হলেন- পৃথিবীর অন্যতম বড় অনলাইনভিত্তিক কোম্পানি আলিবাবা ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান জ্যাক মা। তার জন্ম চীনের জিজিয়াং প্রদেশে ১৯৬৪ সালে।

তার বাবা-মা গান গেয়ে মানুষকে আনন্দ দিয়ে জীবন ধারণ করতেন। শৈশবে আমি উদ্বিঘœ ছিলাম, কিন্তু কখনই ভীত ছিলাম না। আমার প্রতিদ্বন্দ্বীরা সবসময়ই আমার চেয়ে শক্তিশালী ছিল। কিন্তু আমি ভেবেছি আর লড়াই করেছি। শৈশব থেকেই ইংরেজী শেখার জন্য সবসময়ই চীনে বেড়াতে আসা পর্যটকদের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করতেন। এছাড়া, নিজের একটি রেডিও কেনেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল রেডিওতে নিয়মিত ইংরেজী শোনা। ইংরেজী ভাল শিখতে পারলেও গণিতে বারবার ফেল করতেন তিনি। গণিতে জ্যাকের বাজে দশার কারণে কলেজে ভর্তি পরীক্ষায়ও দুইবার ফেল করেছেন। তবে তৃতীয়বারের মতো ভর্তিপরীক্ষা দিয়ে টিকে যান জ্যাক মা। এবার তিনি হাংজু টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ভর্তি হন। ফোবর্স ম্যাগাজিনের হিসেবে জ্যাক মা পৃথিবীর ৩তম ধনী ব্যক্তি।

তার মোট সম্পদের পরিমাণ ২৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। জ্যাক মার জীবনে এতবার ব্যর্থ হওয়ার পরও বড় হওয়ার, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশা থেকে বিন্দুমাত্র পিছপা হননি। অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে তিনি আজকের অবস্থানে এসেছেন। যেই জ্যাক মা চাকরির জন্য ৩০ বার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন সেই জ্যাক মার প্রতিষ্ঠান আলিবাবা ডটকম চীনে নতুন করে ১৪ মিলিয়ন চাকরি তৈরি করেছে।

পড়াশোনা শেষে চাকরি পাচ্ছিলেন না জ্যাক মা। এমনকি তিনি একটি রেস্টুরেন্টে ম্যানেজারের চাকরির জন্যও আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তাও হয়নি। শেষ পর্যন্ত তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী পড়ানোর চাকরি পান। মাসে ১২ ডলার বেতন পেতেন জ্যাক। জ্যাকের এই পরিস্থিতি বদলাতে চীনের রফতানিমুখী ব্যবসায়ীদের সহযোগিতার জন্য একটি অনুবাদ কেন্দ্র চালু করেন। এই অনুবাদ কেন্দ্রের অংশ হিসেবেই জ্যাক জীবনে প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে যান। যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েই প্রথম জানতে পারেন ইন্টারনেট সম্পর্কে। জ্যাক নেটে বিয়ার সম্পর্কে তথ্য জানতে সার্চ করলেন। তিনি দেখলেন, ইন্টারনেটে কোন তথ্যই চাইনিজ ভাষাভাষীদের জন্য নেই। এমনকি চীন নিয়ে কোন তথ্যই নেই! দেশে ফিরে জ্যাক নতুন একটি কোম্পানি খুলে বসলেন। একটি ওয়েবসাইট নির্মাণ করে রফতানিমুখী চীনা কোম্পানিগুলোর তথ্য প্রকাশ করতে শুরু করলেন। জ্যাক মার ওই ওয়েবসাইটটিকে বলা হয় চীনের প্রথম ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ওই ওয়েবসাইটটি ব্যবসায় করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। এর চার বছর পর জ্যাক মা আলিবাবা নামের নতুন একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন।

এই কোম্পানিটিই বর্তমান বিশ্বে ই-কর্মাসের সফলতার দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জ্যাক মা যখন প্রথম আলিবাবা প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি তার ১৭ জন বন্ধুকে বাসায় ডাকেন। তাদের সঙ্গে তিনি তার আইডিয়ার কথা শেয়ার করেন। কিন্তু সবাই তার এই আইডিয়াকে ‘স্টুপিড আইডিয়া’ বলে চলে যায়। পুরো রাতজুড়ে জ্যাক মা তার উদ্যোগের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করেন এবং পরেরদিন তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে অন্যরা যাই বলুক, তিনি এই কাজটি করবেনই। ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে খুব বেশি কিছু না জানলেও কিভাবে ই-কমার্স বাণিজ্যের গুরু হয়ে উঠলেন জ্যাক মা? এই প্রশ্নটির উত্তর দিয়েছেন তার শুরুর দিকের এক সহকর্মী পোর্টার এরিস ম্যান। এরিস ম্যান বলেন, জ্যাক খুব ভাল বক্তা। ও নিজের স্বপ্নগুলো সকলের মধ্যে খুব সহজেই ছড়িয়ে দিতে পারে। জ্যাক আমাদের সবসময় বলত, আমরা সবাই তরুণ এবং কখনই নিজেরা লড়াই থেকে সটকে পড়ব না। জ্যাক মা, নিজের সংগঠনের সহকর্মীদের আনন্দে রাখতেও পটু। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, সুযোগ পেলেই নিজের সহকর্মীদের মুখে হাসি ফুটাতে তৎপর থাকেন জ্যাক। আলিবাবার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জ্যাক মা প্রতিবছর ট্যালেন্ট শো নামের জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন স্থানীয় একটি স্টেডিয়ামে।

ওই অনুষ্ঠানে আলিবাবার কর্মীরা সর্বোচ্চ আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেন। প্রতিষ্ঠানের কাজকে সহজতর করার জন্য ২০০০ সালে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদ থেকে পদত্যাগ করেন জ্যাক মা। এরপর তিনি আলিবাবার চেয়ারম্যান হন। এ প্রসঙ্গে জ্যাক বলেন, একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হওয়ার চেয়ে একজন ভাল চেয়ারম্যান হওয়াতে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জ আছে। তবে জ্যাক মার সফলতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে, মানুষের সমস্যা সমাধানের প্রতি তার আগ্রহকে। তিনি চীনের ব্যবসায়ীদের সমস্যা সমাধান করতে চেয়েছিলেন। আর এই উদ্দেশ্য সফল করার মাধ্যম হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি।

এছাড়া, জ্যাক মার মতো সফল উদ্যোক্তা হতে কি যোগ্যতা প্রয়োজন তা অনুধাবন করা যায়, তার লেখা একটি চিঠি থেকে। চিঠিটি জ্যাম মা লিখেছিলেন তার কর্মীদের উদ্দেশ্য করে। তিনি চিঠিটিতে উল্লেখ করেন- কঠোর পরিশ্রম কিংবা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হওয়ার কারণে আমরা সফল হইনি। আমরা পেরেছি গ্রাহকদের সবচেয়ে বেশ গুরুত্ব দেয়ার কারণে। আর আমরা নিজেদের শক্তি-সামর্থ্যকে সম্মান জানাতে পেরেছি। আমরা বিশ্বাস করেছি যে, সাধারণ মানুষই অসাধারণ নানা কাজ করতে পারে।

625 total views, 3 views today

Related Posts

Share

Comments

comments

রিপোর্টার সম্পর্কে

%d bloggers like this: