রাত ১২:২৪ | বুধবার | ১৯শে জুন, ২০১৯ ইং | ৫ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

দিঘারকান্দায় জনযোদ্ধা খলিলুর রহমানরাও মুক্তিযোদ্ধা, স্বীকৃতি নেই!

আশিক চৌধুরী ॥
১৯৭১.জুন ১৭. ….তারপর। সবাই মনে করেছিল- খলিলুর রহমান মরে গেছেন। পাক সেনারা তাকে নির্যাতন চালিয়ে মেরে ফেলে রেখে গেছে। কিন্তু তিনি মরেননি। তবে তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন, ছিলেন ‘জিন্দালাশ’। শীত এলেই তিনি অন্যরকম হয়ে যেতেন। মাথার যন্ত্রনায় বাঁচতেন না। পাগল হয়ে যেতেন। উ™£ান্ত। অপ্রকৃতস্থ। তার চোখে মুখে ভয়। অসহ্য যন্ত্রনা। দুর্বিসহ এক জীবন যন্ত্রনা। তাকে যেই-ই দেখতো, স্থির থাকতে পারতো না।
‘আহারে বেচারা! মুক্তিযুদ্ধে না গিয়েও মুক্তিযোদ্ধা! মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে নাম না লিখিয়েও মুক্তিযোদ্ধা। জনযোদ্ধা।’ তার কী নিদারুন করুন পরিনতি। শীতকাল পড়লেই চরম অসুস্থ হয়ে যান। স্মৃতিভ্রংশ হয়ে যায়। অজানা অবস্থা। আর তীব্র যন্ত্রনায় অস্থির। আফসোস আর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মানুষ তার মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার কথা স্মরণ করতো। তিনি দিঘারকান্দার খলিলুর রহমান।
মুক্তিযুদ্ধ খলিলুর রহমানের জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছিল সুস্থ স্বাভাবিক জীবন। দিঘারকান্দা একাত্তরে ছিল পাকিস্তানী সেনাদের অস্থায়ী ক্যান্টনমেন্টের পেছনের গ্রাম। তিনি এখানে প্রতিরোধ যুদ্ধ করেছিলেন। ধর্ষণযজ্ঞের হাত থেকে গ্রামের সম্ভ্রম বাঁচাতে সেই যুদ্ধ। সম্মিলিত আক্রমন চালিয়েছিলেন হানাদারদের বিরুদ্ধে। নারী পুরুষ মিলে ওরা মেরেছিলেন ২ হানাদারকে। রুখে দিয়েছিলেন হানাদারদের ‘ধর্ষন অস্ত্র’।
দিঘারকান্দার জনযুদ্ধ। জবাবে শত্রুসেনাদের ব্রাশফায়ার। নিহত হন রহমত আলী। ডাক নাম বদি মিয়া। সেই বদির লাশ মাটিতেই পড়েছিল। হিং¯্র হায়েনারা গ্রামটি চষে রেড়াচ্ছিল। দিঘারকান্দা হয়ে উঠেছিল শ্মশান। ভয়ে গ্রামবাসী যে যেদিকে পেরেছিল, দূরে সরে গিয়েছিল।
সেদিন জনমানব শূন্য দিঘারকান্দায় ৬ যুবকসহ তিনি সাহস দেখিয়েছিলেন। তারা বদি মিয়ার লাশ কবরে নামিয়েছিলেন। আর সে জন্যই তিনি (খলিলুর রহমান) ভয়াবহ মর্মান্তিক পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন। হানাদাররা তাকেও ধরে নিয়ে গিয়েছিল। ভার্সিটিতে ক্যান্টনমেন্টের বন্দীশিবিরে রেখে নির্যাতন করেছিল। যে নির্যাতনের অভিঘাত তার বাকী জীবনটাকে পাল্টে দেয়।
জীবদ্দশায়, শীত এলেই তিনি অস্বাভাবিক হয়ে যেতেন। ‘জীবন-মৃত’ অবস্থা চলতো। এবং তার সেই অবস্থা দেখে মানুষের মনে পড়ে যেতো এটা মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান, স্মৃতি। যা আত্মত্যাগের চেয়ে কম নয়। দেশের জন্য, মুক্তিযুদ্ধের জন্য, তার এই হাল। অমানবিক পরিনাম।
শুধু যুদ্ধে অংশ নেয়াই মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী হওয়া নয়। হানাদার বাহিনীর বর্বর নির্যাতন স্বীকার করার সাহস এর নাম কী হয়? ‘হানাদার নির্যাতিত’ এই বীরের অবস্থান কোথায়-স্বাধীনতার ইতিহাসে। মুক্তিযুদ্ধের দলিলে। আজো উত্তর মিলে না। ইতিহাস এখানেই নীরব।
সেদিন হানাদারদের হাতে নিহত হলে আজ তিনি হতেন ‘শহীদ’। যদি মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র অংশ নিতেন হতেন ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’। কিন্তু তিনি শহীদ হননি অল্পের জন্য। হানাদারদের নির্মম নির্যাতনের মুখে পতিত হয়েছিলেন। সেই নির্যাতিতের সংজ্ঞা কী? প্রশ্ন থেকে যায়- যিনি নির্যাতনে মৃত্যু পথযাত্রী হলেন, কিন্তু মৃত্যু যাকে পরাজিত করতে পারেনি, মুক্তিযুদ্ধের পর সারাজীবন যিনি ‘নিজ জীবনে বয়ে বেড়িয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। তিনি কী !? মুক্তিযোদ্ধা নন!
রাষ্ট্র তাকে কী সান্ত¡না দিবে! কোন সহানুভূতি তার জন্য বাক্সময় হবে; স্বাধীন-সার্ব ভৌম দেশের মুক্তিযুদ্ধে তার করুন পরিনতি কী শুধুই নিছক একটা কাকতালীয় ঘটনা। সেখানে কী রাষ্ট্রের কোন দায় নেই। যখন মুক্তিযুদ্ধে তিনি শহীদের মর্যাদায় লাশ হননি, সত্য কিন্তু আজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন নিজের ‘দু:সহ জীবনের জিন্দা লাশ’। তখন, তার সাহস, তার আবেদনের জন্য কী একটুও স্বীকৃতির ভাষা নেই রাষ্ট্রের অভিধানে। ভয়াবহ নির্যাতন যন্ত্রনার জন্য কোন মর্যাদা কী তিনি পেতে পারে না।
একাত্তরের খলিলুর রহমান শুধু একা নন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন অনেক চরিত্রের দেখা মিলবে। যারা একেকটি খন্ড উপাখ্যানের নাম ভূমিকা। জীবন থেকে নেয়া-এসব কেন্দ্রীয় চরিত্রই মুক্তিযুদ্ধের একেকজন কেন্দ্রীয় চরিত্র; যাদের জীবন কাহিনী উপন্যাসোপম। মহান মুক্তিযুদ্ধের গল্পে তারাও একেকটি অধ্যায়। নামহীন মুক্তিযোদ্ধা। যারা আজো স্বীকৃতি পেলেন না।
দিঘারকান্দার খলিলুর রহমানের জীবন গাঁথা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মা-মাটি-মানুষের অধ্যায়। তিনিসহ ৬ যুবক আব্দুস সালাম, হেলিম মিয়া, আব্দুর রহিম, মনাই মিয়া, জদেব আলী ছিলেন নির্যাতিত। জনযোদ্ধা। যে যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন রহমত আলী ওরফে বদি মিয়া।
হয়তো বা ইতিহাসে ‘তাদের’ নাম লেখা রবে না। কিন্তু তাদেরকে তো উপেক্ষাও করা যাবে না। যাবে কী। মুক্তিযুদ্ধের ট্রাজিক স্মৃতিতে ভাস্কর খলিলুর রহমান শুধু একটি গল্প নয়। একটি দৃষ্টান্ত। একটি মুক্তিযুদ্ধের গল্প। যে গল্পের শেষ নেই। যে গল্পের শিরোনাম নেই।
কিন্তু হাজারো নির্যাতিত খলিলুর রহমান আজ এক অনন্ত প্রশ্ন। ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হলো বলিদান’-তাদেরই একজন দিঘারকান্দার খলিলুর রহমান। যাদের নাম লেখা আছে তার পরিবার-তার সমাজের ‘অশ্রুজলে’।
দিঘারকান্দার যে সমাজ একাত্তরে আক্রান্ত হয়েছিল শত্রুবাহিনীর বিষবাম্পে। যে মাটির কাছে এসে ঘাঁটি গেড়েছিল হানাদার অপশক্তি; মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাস সেই ভয়ংকর অপশক্তির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেছিল সাহসী গ্রামটি।
শত্রুর বেয়নেট আর গুলির মুখে বসবাস করেছিলেন যে মানুষগুলো; যারা আপস করেনি, হয়নি পাক সেনাদের দোসর; যারা প্রতিনিয়ত শত্রুর বিরুদ্ধে ছিল‘প্রতিবাদী দৃষ্টিতে, মুক্তিকামী জনতা।’ যারা শত্রুকে রনাঙ্গনে মোকাবেলা করেছেন নিজ দেশ ও মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার কৌশলে। রাতের পর রাত জেগে রণপাহারা দিয়েছিল দেশের সম্ভ্রম বাঁচাতে। যারা শত্রুর ধ্বংস চেয়েছে, অপেক্ষা করেছে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের। এবং সেই বিজয়ের আগে নিজের পরাজয় মানেননি। আর মানেননি বলেই তারা একদিন আক্রমন করেছেন হানাদার শক্তিকে। গ্রামবাসী চ্যালেঞ্জ করেছিলেন হানাদারদের। তারা যুদ্ধ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বলীয়ান হয়ে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের নির্দেশনায় ছিল তাদের জন্য প্রেরণা ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল, তোমাদের কাছে যা কিছু আছে-তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে…. আমি যদি হুকুম দেবার না পারি…..তোমাদের যা কিছু আছে তাই নেয় প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা-রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিবো-এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো-ইনশাল্লাহ…..’ দিঘারকান্দাবাসী সেদিন বঙ্গবন্ধুর ভাষনের এই মহান বাক্যের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন। নিজের (ঘর গৃহস্থলীর) অস্ত্র নিয়ে লড়েছেন অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে। দিঘারকান্দার বদি মিয়া রক্ত দিয়েছেন। সে দিন দিঘারকান্দাকে মুক্ত করেছেন। জীবন দিয়েছেন। বদি মিয়ার আত্মত্যাগ-কী-বৃথা? তবে তার শহীদী স্বীকৃতি কোথায়? কেন মেলে না?
যে জনযুদ্ধে দিঘারকান্দার মানুষ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষনের মর্মার্থকে তাদের জীবন ইতিহাসে আত্মস্থ করেছিলেন। তরা পাক সেনাদের বিরুদ্ধে ইতিহাসের একটি শ্রেষ্ঠ যুদ্ধ করেছিলেন।
যে যুদ্ধ বদি মিয়ার আত্মদান, বীর নারী গোলাপজান, বীর নারী মুকুতুন্নেসার সাহস। যে নারীরা শত্রুর বিরুদ্ধে লড়েছিলেন বীরাঙ্গনা সখিনার মতো। যে যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধার মতোই অংশ নিয়েছিলেন খলিলুর রহমানরা। যার উপর নির্যাতনের স্টীম রোলার চালিয়েছিল হানাদাররা। শ্বাসরুদ্ধকর লোমহর্ষক নির্যাতন। গুলি না করে হত্যার উদ্দেশ্যে নির্যাতন। ভারী অস্ত্র দিয়ে মাথায়, শরীরে মারাত্মক আঘাত হেনেছিল। অবশেষে তাকে মৃত ভেবে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু খলিলুর রহমান মরেননি। তবে সেটা ছিল তার প্রথম মৃত্যু। তিনি বেঁচে উঠেছিলেন।
যে যুদ্ধে গ্রামবাসীর আক্রমনে পরাস্থ হয়েছিল ক্যান্টনমেন্ট ও হানাদার বাহিনী। যারা যুদ্ধে ধর্ষন অস্ত্র প্রয়োগের জন্য প্লট হিসাবে বেছে নিয়েছিল দিঘারকান্দা গ্রামকে।
সেই সম্ভাব্য ধর্ষনযজ্ঞকে নস্যাৎ করে ধর্ষনোদ্যত হানাদারকে চরম শিক্ষা দিয়েছিল গ্রামবাসী। যেখানে প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন দিঘারকান্দার সাহসী নারীরা।
সে রাতে তারাও হয়ে উঠেছিল একেকজন তারামন বিবি। একেকজন নারী মুক্তিযোদ্ধা। আত্মরক্ষার্থে তরুনী, যুবতী,গৃহবধু, মহিলারা সে রাতে হয়ে উঠেছিল বিদ্রোহীকন্যা। রণরঙ্গিনী। ‘ যার যা ছিল-ঝাটা, হলঙ্গা, পিড়ি, মাছ কাটার বটি দা, রাম দা, খন্তি, বল্লম তাই নিয়ে সশস্ত্র পাকসেনাদের উপর আক্রমন রচনা করেছিল। সেই নারীরা সেইরাতে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিল।
নাজিম উদ্দিনের বউ গোলপজান হয়ে উঠেছিল ইতিহাসের ‘ওমরও জান’। লেবু মন্ডলের বউ মুকুতুন্নেসার হাতে দেশীয় অস্ত্র ঝলসে উঠেছিল। যেন সুলতানা রাজিয়ার তলোয়ার।
স্টেনগানধারী পাঞ্জাবীদের ২ জওয়ান গোলাপজান ও মুকুতুন্নেসার ‘শাবলের ঘাই’ এর আঘাতে ধরাশায়ী হয়। হানাদারদের এই পতন ছিল লজ্জার। কলংকিত যুদ্ধাপরাধীদের ধর্ষন ষড়যন্ত্রের ‘নগদ’ শাস্তি দিয়েছিল গ্রামটির মা -বোনেরা। ১০/১২ জন পাকসেনার ২ জনকে হত্যা ও ৩ জনকে আহত করে গ্রামবাসী। বাকীরা পালায়। আর সেদিন, দিঘারকান্দায় হানাদার বিরোধী এই ‘মুক্তিযুদ্ধটি’ ছিল গ্রামবাসীর পরিকল্পনা। গ্রামের মানুষজন ছিলেন স্বাধীনতার পক্ষে। বয়স বা অন্যান্য কারনে ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার শ্রেষ্ঠ সময় তার’ এর সূত্রে যাদের মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া হয়নি; তারই এক সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।
যেখানে কৌশল ছিল প্রতিরোধ। কৌশল ছিল আক্রমন হলে পাল্টা আক্রমন। ‘ডু অর ডাই’। সচেতন মুরুব্বীদের পরামর্শে একদল সচেতন যুবক প্রস্তুত ছিল। তাদের চেতনায় ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনা তাদের জানা ছিল এবং হানাদার বর্বর পাকি সেনাদের বিরুদ্ধে তারা জেগে উঠেছিল।
রাত জেগে জেগে তারা গ্রাম পাহারা দিত। ‘বস্তিওয়ালা জাগো’ আওয়াজ তুলে নিজেদের প্রস্তুত রাখছিল। এবং ১৭ জুন ১৯৭১। শুক্রবার রাত। গ্রামবাসী ঝাপিয়ে পড়েছিল হানাদারদের ওপর।
পুরুষরা হানাদারদের ঘিরে ফেলেছিল। আর নারীরা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল। দিঘারকান্দার সেই জনযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়।
সেই যুদ্ধের ওরা ৬ জন। বীর বাঙ্গালি। ১৭ জুন যারা জীবন বাজী রেখেছিল। সম্মুখ সমরে শত্রুসেনাদের হতাহত করে পিছু হটিয়ে দিয়েছিল। বিজয় গর্বে সেদিন তারাও ছিল উচ্ছ্বাসিত। ‘ডুবি বাড়িতে’ অবস্থানরত ১০/১৫ জন নারীর ইজ্জত রক্ষা করেছিল। কিন্তু সেই রাতে গ্রামবাসীর নিরাপত্তার প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠেছিল।
২ পাঞ্জাবী সৈন্যকে হত্যা ও ৩ জনকে আহত করার পরবর্তী সম্ভাব্য পরিনতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন গ্রামবাসী। তারা দ্রুত নিরাপদ স্থলের সন্ধানে আত্মগোপন করেন। স্বেচ্ছা নির্বাসিত হন।
আর সেই রাতেই ওই যুবকরা নিহত ১ পাক সেনার লাশ টেনে হিচড়ে দেড় কিলোমিটার দুরে নিয়ে মাটিচাপা দিয়ে গুম করেন।
পরদিন ‘পাগলা কুত্তার’ মতো পাকসেনারা গ্রামে ঢুকে। ‘ মানুষ না মাটি’ চাই বলে অগ্নিসংযোগ করে গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। আক্রোশে বারবার গুলি ছুড়তে থাকে। ভীতিকর অবস্থা। গোটা গ্রাম শ্মশানে পরিনত হয়।
এর মধ্যে গ্রামটিতে পড়ে থাকে বদির লাশ। তারপর ঝুকির মধ্যেও লাশের দাফন হয়। দৃশ্যমান এ কাজে অংশ নেয়াই কাল হয় খলিলুর রহমানের। টার্গেট আর সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দুতে পড়ে যান তিনি।
সবাই মনে করেছিলেন, পাকিস্তানীরা তাকে মেরে ফেলেছে। চরম নির্যাতন করেছে। অমানবিক, পাশবিক, ভয়াবহ, বর্বর নির্যাতন। নির্যাতিত খলিলুর রহমানের আত্মচিৎকারে কেপে উঠেছিল এলাকা। তার আর্তনাদে বাতাস স্তব্ধ হয়ে যায়। দিঘারকান্দায় সেদিন ছিল ভয়াবহ একটা দিন। সেদিন ছিল একটা ভয়াল দিবস।
ভার্সিটিতে ছিল হানাদারদের ক্যাম্প। তার ভেতর টর্চার সেল। সেখানেই চলছিল লোমহর্ষক নির্যাতন। আর বন্দী খলিলুর রহমান নির্যাতনের যন্ত্রনায় ছটফট করছিলেন। নির্মম, নৃশংস, চরম নির্যাতন। অসহ্য নির্যাতনে বারবার জ্ঞান হারান খলিল। অজ্ঞান অবস্থাতেও বিরাম ছিল না। উপর্যুপরি নির্যাতন। খানসেনাদের একটা দল পালাক্রমে তাকে মারছিল।
খলিলুর রহমানের উপরকার নির্যাতনের মাত্রা ছিল চরম ভয়াবহমাত্রায়। পাকসেনাদের আক্রোশ তার বিরুদ্ধেই। প্রতিশোধের নেশায় ওরা উন্মুত্ত।
ইচ্ছা করলে এক গুলিতেই খতম করে দিতে পারতো। না হলে ব্রাশ ফায়ারে ঝাঝরা করে দিতে পারতো। চোখে কালো কাপড় বেধেঁ ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করতে পারেতো। কিন্তু খলিলুর রহমানের ক্ষেত্রে সে শাস্তি যেন যথেষ্ঠ নয়। কঠিন শাস্তি। তিলে তিলে মৃত্যুযন্ত্রনা দিয়ে তাকে শেষ করাটাই যেন ছিল উদ্দেশ্য। ভয়ংকর পৈশাচিকতা চলে তার উপর।
সেই দৃশ্য দেখে ঠিক থাকতে পারে না কেউ। অন্য নির্যাতিতরা পর্যন্ত নিজের অসহ্য যন্ত্রনা ভুলে যায়। চোখের সামনের সেই অমানষিক নির্যাতন সবার মনে মৃত্যুভীতি এনে দিয়েছিল। আর মৃত্যু যেন ভুলে গিয়েছিল খলিলকে। মরণঘাতী নির্যাতন। ওমন নির্যাতনে কেউ বাঁচে না। মুমুর্ষ খলিলুর রহমান। তার জন্য মৃত্যুদন্ডই ঘোষনা করেছিল হানাদাররা। বলছিল ‘এরা হচ্ছে মুক্তিবাহিনীর লোক। এরাই মেরেছে। একে খতম করে দেবো। যেন আর কেউ সাহস না পায় পাঞ্জাবীদের মারতে।’ উর্দুভাষায় ছিল সেই হুংকার। সেনা ক্যাম্পে সালাম, হেলিম, রহিম, মনাই, জবেদ আলীরাও নির্যাতনের স্বীকার হয়েছিলেন।
প্রেক্ষিত দিঘারকান্দা ১৯৭১
দিঘারকান্দা। মহান মুক্তিযুদ্ধের এক উপাখ্যান। ময়মনসিংহ জেলা সদরের বয়ড়া ইউনিয়নের গ্রামটির পাশেই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে এপ্রিল মাসের শেষ দিকে হানাদার বাহিনী অস্থায়ী ক্যান্টনমেন্ট গড়ে তুলেছিল। মাত্র ২ মাস পরই দিনটি ছিল ১৭ জুন। শুক্রবার। দিঘারকান্দা পুরাতন ডুপিবাড়িতে ২ পাকসেনাকে হত্যা করে এলাকাবাসী। পাকসেনা হত্যার এই ইতিহাস ‘দিঘারকান্দা জনযুদ্ধ’ নামে খ্যাত। ক’জন ‘অজানা মুক্তিযোদ্ধার’ খন্ডযুদ্ধ সেটি। যে যুদ্ধে গ্রামের যুবক শ্রেনীর পাশে নারীর অংশগ্রহন ও ভূমিকার ইতিকথাও আজ এক কিংবদন্তি। মুক্তিযুদ্ধের গল্প।
এ ব্যাপারে বীর মুক্তিযোদ্ধা বিমলপাল ‘মুক্তিযুদ্ধ: ময়মনসিংহ- দিঘারকান্দার জনযুদ্ধ’ নিবন্ধ লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের গল্পের ফেরিওয়ালা হিসাবে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি মুক্তিযুদ্ধের যে গল্প বলেন- সেখানে ‘দিঘারকান্দার যুদ্ধ’ ইতিহাস বয়ান করেন।
ময়মনসিংহের মুক্তিযুদ্ধের গবেষক, সাংবাদিক লেখক, মাটি ও মানুষ এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আশিক চৌধুরীর লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধে ময়মনসিংহ-১৯৭১’ গবেষনায় দিঘারকান্দার সেই মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ও বীরত্বগাঁথা বিধৃত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে যা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
সম্প্রতি, দিঘারকান্দা যুদ্ধ ইতিহাসের প্রামান্য তথ্য ও ব্যাটেল স্টাডি-সংগ্রহে মাঠে নামেন সাংবাদিক গবেষকদের একটি দল। সরজমিনে তারা কথা বলেন একাত্তরের প্রত্যক্ষদর্শী ও ওয়াকিবহাল মহলের সাথে।
মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত খলিলুর রহমানের সন্তান দৈনিক মাটি ও মানুষ সম্পাদক প্রকাশক একেএম ফখরুল আলম বাপ্পী চৌধুরী। সাংবাদিক লেখক স্বাধীন চৌধুরী, মাটি ও মানুষ বার্তা সম্পাদক বিল্লাল হোসেন প্রান্তকে সাথে নিয়ে তিনি দিঘারকান্দা জনযুদ্ধের স্বরূপ, বাস্তবতা, পটভূমি ও প্রভাব সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধান করছেন।
দিঘারকান্দা ডুপিরবাড়িতে পাকসেনা খতম ও এর জের ধরে এলাকার যুবকদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করে হানাদাররা। যা নির্যাতনের নির্মম বেদনার বিস্তর কাহিনী আর ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধকালীন বীর জনতার এই যুদ্ধ-এক অসামান্য কাহিনী। জনযুদ্ধ।
এ নিয়ে কথা বলেন, সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সেদিনের তরুণ যুবকদের সাথে। যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: গিয়াস উদ্দিন, নাট্যকার ও অভিনেতা মো: হারুন মিয়া, দিঘারকান্দা ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান মো: আব্দুল মালেক। তাদের স্মরনে আছে একাত্তরের স্মৃতি। যা কোন দিন ভোলার মত নয়। তাদের স্মৃতি কথায় উঠে আসে ডুপিরবাড়িতে সেই রাতের ভয়াবহ যুদ্ধের কথা।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অনেক ঘটনা রয়েছে। অনেক যুদ্ধ জনযুদ্ধ। যা মুক্তিযুদ্ধের পরিপুরক। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে যার অধিকতর মূল্যায়ন হওয়া বাঞ্চনীয়। কেননা, জনযুদ্ধও গুরুত্বপূর্ন। প্রকৃত প্রস্তাবে যা মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গ। পাকসেনাদের ক্যান্টনমেন্টের পাশের গ্রামবাসী আক্রমন চালিয়ে পাকসেনাদের হতাহত করেন। এবং যুদ্ধের পরবর্তী ভয়াবহ দিনগুলোতে তারা হুমকি ও ঝুকির মুখেও নিজ এলাকায় ছিলেন। হানাদার বাহিনীর উপর আক্রমনের দায়ে দিঘারকান্দার ৬ যুবক মৃত্যুর মুখে পড়েন। নির্যাতিত হয়েও তারা বেঁচে গিয়েছিলেন। তাদের সাহস এবং বীরত্ব মূল্যায়নের দাবি রাখে। যা সামগ্রিক অর্থে মুক্তিযুদ্ধই।
সেই যুদ্ধবীরদের কথা সচেতন মহল স্মরণ করেন।‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তাদের কিভাবে মূল্যায়ন করবে-তা তাদের অজানা।’ কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে দিঘারকান্দার অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। যোগ করেন স্থানীয় সচেতন মহল।
মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তিতে নির্যাতিত খলিলুর রহমান পিতা- কাছম আলী মুন্সী, আব্দুস সালাম পিতা- আইন উদ্দিন মন্ডল, মো: আব্দুল বারেক পিতা- ছফর উদ্দিন মন্ডল, গিয়াস উদ্দিন পিতা- নেকবব আলী, মো: হারুন মিয়া পিতা- আলাউদ্দিন মাষ্টার, আব্দুর রহিম পিতা- আব্দুর গফুর, মনাই মিয়া পিতা-অজ্ঞাত, জবেদ আলী পিতা-অজ্ঞাত, আজমত মুন্সী পিতা- হবি শেখ, নাজিম উদ্দিন, ইয়াকুব আলী, কুদ্দুছ, জুলু, কাবিল, কাশেম, লতিফ, আলাল এর নাম অমর হয়ে থাকবে।
যেমন অমর হয়ে থাকবেন শহীদ রহমত আলী ওরফে বদি মিয়া। হানাদারদের মারতে গিয়ে সম্মুখ যুদ্ধে যিনি গুলিবিদ্ধ হন। ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন গোলাপজান ও মুকুতুন্নেসার নাম। যারা-আগ্নেয়াস্ত্রধারী ২ পাকসেনাকে শাবলের ঘাই মেরে হত্যা করেছিলেন। এই দুই বীর নারী মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিলেন।
পাক সেনাদের ক্যাম্পে চরম নির্যাতিত হয়েছিলেন-খলিলুর রহমান, আব্দুস সালাম, হেলিম মিয়া, আব্দুর রহিম, মনাই মিয়া, জবেদ আলী। মুক্তিযুদ্ধে স্বত:স্ফূর্ত অংশ নিয়ে এরা দিঘারকান্দায় পাকসেনাদের ঘেরাও করেছিলেন। নারী-পুরুষ মিলিত ভাবে আক্রমন চালিয়ে পাকসেনাদের খতম করেছিলেন। লাশ গুম করেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস অবরুদ্ধ জনপদে থেকেও তারা পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তারা বিজয়ী হয়েছিলেন। হানাদারদের ক্যান্টনমেন্টের পাশের এলাকায় একখন্ড স্বাধীন, মুক্ত অঞ্চলে পরিনত করেছিলেন দিঘারকান্দাকে। পাকসেনা হত্যার ঘটনায় হিং¯্র হানাদাররা দিঘারকান্দাকে তছনছ করে ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু বাকী দিনগুলোতে ওরা সাহস পায়নি গ্রামটিতে প্রবেশের।
সুতরাং শুধু শহীদ বদি মিয়া বা নির্যাতিত ৬ জনযোদ্ধা, গুলিবিদ্ধ ২ যুবক ও ২ সাহসী নারীসহ দিঘারকান্দা গ্রামের নারী-পুরুষ যুদ্ধের দিনগুলোতে যে ইতিহাস গড়েছেন তা অবিস্মরনীয়। হানাদারদের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীর যুদ্ধজয় আসলেই ঐতিহাসিক ঘটনা।
ডুপিরবাড়ি ব্যাটেল ফিল্ড
দিঘারকান্দার ডুপিরবাড়ি। অবস্থানগত কারনে বাড়িটি ছিল ঝোপঝাড়, জংলার ভেতর। সামনে পুকুর। রাস্তা অনুন্নত। অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বিবেচিত হওয়ায় রাতের বেলায় তরুনী, যুবতী ,গৃহবধুরা এই বাড়িতে এসে আশ্রয় নিত। হানাদারদের হাত থেকে বাঁচতে এলাকার নারীদের লুকিয়ে রাখতে হতো। অত্মগোপনে থেকেও প্রতিনিয়ত ভয়ের মধ্যে থাকতে হতো নারীদের। আতংকগ্রস্থ দিনরাত একাকার। সে এক ভয়াবহ অবস্থা।
একাত্তরে পাকসেনারা কৃষি ভার্সিটিতে ক্যাম্প করায় কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন দিঘারকান্দা গ্রামবাসী। হানাদারদের ভয়ে অনেকেই এলাকা ছেড়ে দুরে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নেন। আর যারা গ্রামে ছিলেন তারা প্রতিনিয়ত ছিলেন শংকিত।
সবচেয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল মেয়েদের নিয়ে। তাদের গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখতে হতো। আর গ্রাম ও নারীদের নিরাপত্তায় লোকজন গোটা এলাকায় নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্ঠনী গড়ে তুলেছিল। যুদ্ধের উত্তাপে বিপন্ন গ্রাম ছিল দিঘারকান্দা।
একসময় এলাকার মুরুব্বীরা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। এবং যুবকদের পথে ঘাটে সর্তক অবস্থান নিতে বলেন। রাতের বেলায় দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তারা ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থেকে, এলাকা পাহারা দিত। তাদের একটা দল নাইটগার্ড হিসেবে সারারাত জেগে থাকতো। শত্রুসেনাদের গতিবিধির উপর তীক্ষ্ম নজর রাখতো। বিপদ এলে ‘বস্তিওয়ালা জাগো’ বলে সংকেত দিত।
প্রত্যক্ষদর্শীদের কথা
এদিকে কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্প থেকে পাকসেনারা এসে মাঝে মাঝেই গ্রামে ঢুকে পড়তো। বিভিন্ন বাড়িতে ঢুকে যুবতী মেয়ে খুজতো। এলাকার মা বোনদের উপর জঘন্য বর্বর নির্যাতন চালানোর চেষ্টা করতো। দিনে মেয়েদের না পেয়ে প্রায় রাতেও এলাকায় হানা দিতো। রাতজাগা এলাকাবাসীর কৌশলগত প্রতিরোধে তারা সফল হতে পারতো না। ফলে এলাকার নিরীহ মানুষের পেছনেই যারপর নাই অত্যাচার-জুলুম এর নেশায় লেগে থেকেছে হানাদাররা।
পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছিল। এ অবস্থায় গ্রামবাসী সিদ্ধান্ত নেয়-‘হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে সর্বাত্মক যুদ্ধ করা হবে। মরার আগে শত্রুসেনাদের মারতে হবে।’ মহিলাদেরও বলে দেয়া হয় আক্রান্ত হলেই মুহুর্তেই আক্রমন। ফলে গ্রামবাসীর মধ্যে এক ধরনের যুদ্ধ যুদ্ধ উত্তেজনা কাজ করছিল। হানাদারদের বিরুদ্ধে গ্রামটি শক্ত মানসিক অবস্থান নেয়।
তারপর এলো সেই ভয়াল ১৭ জুন। শত্রুসেনাদের গুপ্তচররা খবর পৌছে দিয়েছিল। ডুপিরবাড়ির গহীন অরণ্যের ভেতরেই সচরাচর লুকিয়ে থাকে গ্রামের নারীরা। বিকেলে এক খানসেনা এলাকা রেকি করে যায়। যা এলাকার যুবকদের চোখ এড়িয়ে যায়নি। মেয়েদের অন্যত্র সরানোর সুযোগও ছিল না। ফলে সম্ভাব্য বিপদ আঁচ করতে পেরে সকলেই প্রস্তুত হয়ে থাকে। গ্রামের নিরাপদ অবস্থানের কয়েকটি বাড়িতে অধিকাংশ নারীদের সরিয়ে নেয়া হয়। তারপরও অন্তত: ১৫ জন যুবতী সে রাতে ছিলেন ডুপিরবাড়িতে।
রাত নেমে আসার পর ১৫/২০ জনের একটি দল সরাসরি এসে ডুপির বাড়ির জঙ্গলে ঢুকে। রাত তখন ১২টা। তারা ‘ যুবতী মেয়ের’ সন্ধানে উন্মত্ত হয়ে পড়ে। সে সময়ে কৌশল মোতাবেক এলাকার যুবকদের একটি দল সর্তক হয়ে উঠে। ডুপির বাড়ির চারিদিকে অবস্থান থেকে তারা পাকসেনাদের ঘিরে ফেলে।
দুই পাকসেনা একটি অন্ধকার ঘরে ঢুকে পড়ে। মেয়েদের পেয়ে ধরতে যায়। সে সময়েই শাবলের আঘাত। মরণ চিৎকার দিয়ে এক পাকসেনা ঘটনাস্থলেই মরে যায়। অন্য হানাদার ঘর থেকে দৌড়ে পালাতে গেলে মহিলারা তার উপর দা, লাঠি, ঝাড়–, বল্লম- যার হাতে যা ছিল সেটা নিয়েই হামলা চালায়। পলায়ন উদ্যত পাকসেনা গুরুতর আহত হয়। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এসময় আরো ৩ জন পাকসেনাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে মেয়েরা। পাকসেনাদের উপর নারীদের হামলার সাথে সাথে গোপন অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসে যুবকরা। হৈচৈ করে ধাওয়া করে। তাদের সবার হাতে রামদা, বল্লম। দেশীয় ধারালো অস্ত্র।
অবস্থা বেগতিক দেখে বাকী পাকসেনারা দ্রুত এলাকা ছাড়ে। কেউ কেউ অস্ত্রশস্ত্র ফেলে পালিয়ে যায়। কেউ কেউ যাবার সময় এলোপাথাড়ি গুলি বর্ষন করতে থাকে। গুলির শব্দে প্রকম্পিত হতে থাকে গ্রামটি। এ সময় রহমত আলী ওরফে বদি মিয়া এক হানাদারকে বল্লম দিয়ে আঘাত করেন। হানাদাররা ব্রশফায়ার করে। গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন বদি মিয়া। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন নাজিম উদ্দিন ও আজমত মুন্সী। যুদ্ধাহত এই দু জনযোদ্ধা অল্পের জন্য বেঁচে যান।
হিং¯্র হানাদারদের গুলির মধ্যেও সে রাতে এলাকার নারী পুরুষ হয়ে উঠেছিল মুক্তি পাগল। ক্যান্টনমেন্টের পাশের গ্রামবাসীর এই ‘অভ্যূত্থান’ হানাদারদের মনে ভয় ধরিয়ে দেয়। সেই রাতে তারা আর গ্রামে ঢুকার সাহস পায়নি।
এদিকে, নিহত পাকসেনার লাশ গ্রামবাসী টেনে হিচড়ে ১ কিলোমিটার দূরে নিয়ে মাটিচাপা দেয়। পরদিন খানসেনারা গ্রামে ঢুকে নিহত সৈনিকের লাশের খোঁজে ব্যাপক তল্লাশী শুরু করে। শুরু হয় ব্যাপক নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, তান্ডবলীলা।
এদিকে, সর্তক গ্রামবাসী প্রাণ ভয়ে সরে যাওয়ায় এলাকা জনশূন্য হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ডুপির বাড়ির পুকুরপাড়ে পড়ে থাকে শহীদ বদির লাশ।
পরদিন লাশ দাফনে এগিয়ে আসে ৬ যুবক। দাফনের পর হানাদাররা তাদেরকে অস্ত্রের মুখে ধরে নেয়। নিহত পাকসেনার লাশের সন্ধানে তাদের উপর শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদে নামে নির্মম নির্যাতন।
সেসময়ে যুদ্ধবন্দী যুবকদের উদ্ধার করতে মুরব্বীরা যোগাযোগ করে হানাদারদের ২ দোসর আব্দুল হান্নান ও মেহেদী খানের সাথে। যুবকদের ছেড়ে দেয়ার শর্তে লাশের সন্ধান দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়।
হানাদারদের দোসর হলেও হান্নানরা সেদিন এলাকার স্বার্থে ও সেন্টিমেন্টকে গুরুত্ব দেয়। তারা টর্চার সেলে যায়। এবং কৌশলে পানি আনার কথা বলে একেকজনকে পালিয়ে যাবার সুযোগ করে দেয়। কিন্তু খলিলুর রহমানকে হানাদাররা ছাড়েনি। তার উপর চালায় ভয়ংকর নির্যাতন। অবশেষে তাকে মৃত ভেবে ক্যাম্পের বাইরে ফেলে দেয়।
পরিবারের সদস্যরা রাতের অন্ধকারে লাশ আনতে গিয়ে দেখেন খলিলুর রহমানের দম আছে। মৃতপ্রায় বিধ্বস্ত দেহের খলিলুর রহমান আল্লাহর কৃপায় বেচেঁ যান। কিন্তু পাকসেনাদের নির্মম নির্যাতনের ভয়াবহ যন্ত্রনায় আমৃত্যু তিনি ছিলেন নির্যাতনের ভয়াবহ যন্ত্রনায়। আমৃত্যু তিনি ছিলেন অসুস্থ। কখনো কখনো মানসিক ভারসাম্যহীন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এই অব্যক্ত বীরত্বগাঁথা চির অম্লান।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ খবর



» �BANGLADESH vs WEST INDIES Live Comentry । বাংলাদেশ বনাম �ওয়েস্ট ইন্ডিস সরাসরি ধারাভাষ্য�

» উত্তরা পশ্চিম থানার ‘নাগরিক তথ্য সংগ্রহ সপ্তাহ-২০১৯’ র‌্যালি

» দুই শতাধিক সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে এক্সওয়ার ঈদ উপহার 

» ঈদ উপলক্ষে উত্তরার আবাসিকে নিরাপত্তা জোরদার

» উত্তরার আব্দুল্লাহপুরে এখন ঘর মুখো মানুষের ভিড় 

» শুভ আলোর বিশিষ্টজনদের সম্মানে ইফতার মাহফিল

» স্বপ্ন মাল্টিমিডিয়া ব্যানারে আসছে থমাস সরকার লিওনার্দ্যে এর রোমান্টিক গানের মিউজিক ভিডিও ”মেঘলা আকাশ ”

» স্বপ্ন মাল্টিমিডিয়া ব্যানারে আসছে শিবলু মাহমুদ এর রোমান্টিক গানের মিউজিক ভিডিও ”ধোঁকা ”

» শিন শিন জাপান হসপিটালে এ বিনামূল্যে চিকিৎসা

» ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের মাঝে অনুদান বিতরণ সম্পন্ন ডিএনসিসি ৫০নং ওয়ার্ড

» হুমকির মুখে চা শিল্প , দাবীতে আপসহীন চা শ্রমিক !!

» শাহজালালে ৩৪ শত ইয়াবাসহ একযাত্রী আটক

» উত্তরা ৫১ নং ওর্য়াড যুবলীগের ইফতার মাহফিল

» এবার উত্তরায় চক্রাকার বাস সার্ভিস চালু

» টঙ্গী সাংবাদিক ক্লাবের কার্য নির্বাহী কমিটি ঘোষনা সভাপতি নোয়াব আলী ও সম্পাদক হালিম রিজভী

আমাদের সঙ্গী হোন

যোগাযোগ

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় –

বাসা#৪৯, রোড#০৮, তুরাগ, ঢাকা।
বার্তা কক্ষ : 01781804141
ইমেইল : timesofbengali@gmail.com

 

© এ.আর খান মিডিয়া ভিশন এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান

      সর্বস্বত্ব স্বাত্বাধিকার টাইমস্ অফ বেঙ্গলী .কম

কারিগরি সহযোগিতায় এ.আর খান হোস্ট

,

দিঘারকান্দায় জনযোদ্ধা খলিলুর রহমানরাও মুক্তিযোদ্ধা, স্বীকৃতি নেই!

আশিক চৌধুরী ॥
১৯৭১.জুন ১৭. ….তারপর। সবাই মনে করেছিল- খলিলুর রহমান মরে গেছেন। পাক সেনারা তাকে নির্যাতন চালিয়ে মেরে ফেলে রেখে গেছে। কিন্তু তিনি মরেননি। তবে তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন, ছিলেন ‘জিন্দালাশ’। শীত এলেই তিনি অন্যরকম হয়ে যেতেন। মাথার যন্ত্রনায় বাঁচতেন না। পাগল হয়ে যেতেন। উ™£ান্ত। অপ্রকৃতস্থ। তার চোখে মুখে ভয়। অসহ্য যন্ত্রনা। দুর্বিসহ এক জীবন যন্ত্রনা। তাকে যেই-ই দেখতো, স্থির থাকতে পারতো না।
‘আহারে বেচারা! মুক্তিযুদ্ধে না গিয়েও মুক্তিযোদ্ধা! মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে নাম না লিখিয়েও মুক্তিযোদ্ধা। জনযোদ্ধা।’ তার কী নিদারুন করুন পরিনতি। শীতকাল পড়লেই চরম অসুস্থ হয়ে যান। স্মৃতিভ্রংশ হয়ে যায়। অজানা অবস্থা। আর তীব্র যন্ত্রনায় অস্থির। আফসোস আর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মানুষ তার মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার কথা স্মরণ করতো। তিনি দিঘারকান্দার খলিলুর রহমান।
মুক্তিযুদ্ধ খলিলুর রহমানের জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছিল সুস্থ স্বাভাবিক জীবন। দিঘারকান্দা একাত্তরে ছিল পাকিস্তানী সেনাদের অস্থায়ী ক্যান্টনমেন্টের পেছনের গ্রাম। তিনি এখানে প্রতিরোধ যুদ্ধ করেছিলেন। ধর্ষণযজ্ঞের হাত থেকে গ্রামের সম্ভ্রম বাঁচাতে সেই যুদ্ধ। সম্মিলিত আক্রমন চালিয়েছিলেন হানাদারদের বিরুদ্ধে। নারী পুরুষ মিলে ওরা মেরেছিলেন ২ হানাদারকে। রুখে দিয়েছিলেন হানাদারদের ‘ধর্ষন অস্ত্র’।
দিঘারকান্দার জনযুদ্ধ। জবাবে শত্রুসেনাদের ব্রাশফায়ার। নিহত হন রহমত আলী। ডাক নাম বদি মিয়া। সেই বদির লাশ মাটিতেই পড়েছিল। হিং¯্র হায়েনারা গ্রামটি চষে রেড়াচ্ছিল। দিঘারকান্দা হয়ে উঠেছিল শ্মশান। ভয়ে গ্রামবাসী যে যেদিকে পেরেছিল, দূরে সরে গিয়েছিল।
সেদিন জনমানব শূন্য দিঘারকান্দায় ৬ যুবকসহ তিনি সাহস দেখিয়েছিলেন। তারা বদি মিয়ার লাশ কবরে নামিয়েছিলেন। আর সে জন্যই তিনি (খলিলুর রহমান) ভয়াবহ মর্মান্তিক পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন। হানাদাররা তাকেও ধরে নিয়ে গিয়েছিল। ভার্সিটিতে ক্যান্টনমেন্টের বন্দীশিবিরে রেখে নির্যাতন করেছিল। যে নির্যাতনের অভিঘাত তার বাকী জীবনটাকে পাল্টে দেয়।
জীবদ্দশায়, শীত এলেই তিনি অস্বাভাবিক হয়ে যেতেন। ‘জীবন-মৃত’ অবস্থা চলতো। এবং তার সেই অবস্থা দেখে মানুষের মনে পড়ে যেতো এটা মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান, স্মৃতি। যা আত্মত্যাগের চেয়ে কম নয়। দেশের জন্য, মুক্তিযুদ্ধের জন্য, তার এই হাল। অমানবিক পরিনাম।
শুধু যুদ্ধে অংশ নেয়াই মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী হওয়া নয়। হানাদার বাহিনীর বর্বর নির্যাতন স্বীকার করার সাহস এর নাম কী হয়? ‘হানাদার নির্যাতিত’ এই বীরের অবস্থান কোথায়-স্বাধীনতার ইতিহাসে। মুক্তিযুদ্ধের দলিলে। আজো উত্তর মিলে না। ইতিহাস এখানেই নীরব।
সেদিন হানাদারদের হাতে নিহত হলে আজ তিনি হতেন ‘শহীদ’। যদি মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র অংশ নিতেন হতেন ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’। কিন্তু তিনি শহীদ হননি অল্পের জন্য। হানাদারদের নির্মম নির্যাতনের মুখে পতিত হয়েছিলেন। সেই নির্যাতিতের সংজ্ঞা কী? প্রশ্ন থেকে যায়- যিনি নির্যাতনে মৃত্যু পথযাত্রী হলেন, কিন্তু মৃত্যু যাকে পরাজিত করতে পারেনি, মুক্তিযুদ্ধের পর সারাজীবন যিনি ‘নিজ জীবনে বয়ে বেড়িয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। তিনি কী !? মুক্তিযোদ্ধা নন!
রাষ্ট্র তাকে কী সান্ত¡না দিবে! কোন সহানুভূতি তার জন্য বাক্সময় হবে; স্বাধীন-সার্ব ভৌম দেশের মুক্তিযুদ্ধে তার করুন পরিনতি কী শুধুই নিছক একটা কাকতালীয় ঘটনা। সেখানে কী রাষ্ট্রের কোন দায় নেই। যখন মুক্তিযুদ্ধে তিনি শহীদের মর্যাদায় লাশ হননি, সত্য কিন্তু আজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন নিজের ‘দু:সহ জীবনের জিন্দা লাশ’। তখন, তার সাহস, তার আবেদনের জন্য কী একটুও স্বীকৃতির ভাষা নেই রাষ্ট্রের অভিধানে। ভয়াবহ নির্যাতন যন্ত্রনার জন্য কোন মর্যাদা কী তিনি পেতে পারে না।
একাত্তরের খলিলুর রহমান শুধু একা নন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন অনেক চরিত্রের দেখা মিলবে। যারা একেকটি খন্ড উপাখ্যানের নাম ভূমিকা। জীবন থেকে নেয়া-এসব কেন্দ্রীয় চরিত্রই মুক্তিযুদ্ধের একেকজন কেন্দ্রীয় চরিত্র; যাদের জীবন কাহিনী উপন্যাসোপম। মহান মুক্তিযুদ্ধের গল্পে তারাও একেকটি অধ্যায়। নামহীন মুক্তিযোদ্ধা। যারা আজো স্বীকৃতি পেলেন না।
দিঘারকান্দার খলিলুর রহমানের জীবন গাঁথা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মা-মাটি-মানুষের অধ্যায়। তিনিসহ ৬ যুবক আব্দুস সালাম, হেলিম মিয়া, আব্দুর রহিম, মনাই মিয়া, জদেব আলী ছিলেন নির্যাতিত। জনযোদ্ধা। যে যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন রহমত আলী ওরফে বদি মিয়া।
হয়তো বা ইতিহাসে ‘তাদের’ নাম লেখা রবে না। কিন্তু তাদেরকে তো উপেক্ষাও করা যাবে না। যাবে কী। মুক্তিযুদ্ধের ট্রাজিক স্মৃতিতে ভাস্কর খলিলুর রহমান শুধু একটি গল্প নয়। একটি দৃষ্টান্ত। একটি মুক্তিযুদ্ধের গল্প। যে গল্পের শেষ নেই। যে গল্পের শিরোনাম নেই।
কিন্তু হাজারো নির্যাতিত খলিলুর রহমান আজ এক অনন্ত প্রশ্ন। ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হলো বলিদান’-তাদেরই একজন দিঘারকান্দার খলিলুর রহমান। যাদের নাম লেখা আছে তার পরিবার-তার সমাজের ‘অশ্রুজলে’।
দিঘারকান্দার যে সমাজ একাত্তরে আক্রান্ত হয়েছিল শত্রুবাহিনীর বিষবাম্পে। যে মাটির কাছে এসে ঘাঁটি গেড়েছিল হানাদার অপশক্তি; মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাস সেই ভয়ংকর অপশক্তির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেছিল সাহসী গ্রামটি।
শত্রুর বেয়নেট আর গুলির মুখে বসবাস করেছিলেন যে মানুষগুলো; যারা আপস করেনি, হয়নি পাক সেনাদের দোসর; যারা প্রতিনিয়ত শত্রুর বিরুদ্ধে ছিল‘প্রতিবাদী দৃষ্টিতে, মুক্তিকামী জনতা।’ যারা শত্রুকে রনাঙ্গনে মোকাবেলা করেছেন নিজ দেশ ও মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার কৌশলে। রাতের পর রাত জেগে রণপাহারা দিয়েছিল দেশের সম্ভ্রম বাঁচাতে। যারা শত্রুর ধ্বংস চেয়েছে, অপেক্ষা করেছে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের। এবং সেই বিজয়ের আগে নিজের পরাজয় মানেননি। আর মানেননি বলেই তারা একদিন আক্রমন করেছেন হানাদার শক্তিকে। গ্রামবাসী চ্যালেঞ্জ করেছিলেন হানাদারদের। তারা যুদ্ধ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বলীয়ান হয়ে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের নির্দেশনায় ছিল তাদের জন্য প্রেরণা ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল, তোমাদের কাছে যা কিছু আছে-তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে…. আমি যদি হুকুম দেবার না পারি…..তোমাদের যা কিছু আছে তাই নেয় প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা-রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিবো-এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো-ইনশাল্লাহ…..’ দিঘারকান্দাবাসী সেদিন বঙ্গবন্ধুর ভাষনের এই মহান বাক্যের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন। নিজের (ঘর গৃহস্থলীর) অস্ত্র নিয়ে লড়েছেন অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে। দিঘারকান্দার বদি মিয়া রক্ত দিয়েছেন। সে দিন দিঘারকান্দাকে মুক্ত করেছেন। জীবন দিয়েছেন। বদি মিয়ার আত্মত্যাগ-কী-বৃথা? তবে তার শহীদী স্বীকৃতি কোথায়? কেন মেলে না?
যে জনযুদ্ধে দিঘারকান্দার মানুষ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষনের মর্মার্থকে তাদের জীবন ইতিহাসে আত্মস্থ করেছিলেন। তরা পাক সেনাদের বিরুদ্ধে ইতিহাসের একটি শ্রেষ্ঠ যুদ্ধ করেছিলেন।
যে যুদ্ধ বদি মিয়ার আত্মদান, বীর নারী গোলাপজান, বীর নারী মুকুতুন্নেসার সাহস। যে নারীরা শত্রুর বিরুদ্ধে লড়েছিলেন বীরাঙ্গনা সখিনার মতো। যে যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধার মতোই অংশ নিয়েছিলেন খলিলুর রহমানরা। যার উপর নির্যাতনের স্টীম রোলার চালিয়েছিল হানাদাররা। শ্বাসরুদ্ধকর লোমহর্ষক নির্যাতন। গুলি না করে হত্যার উদ্দেশ্যে নির্যাতন। ভারী অস্ত্র দিয়ে মাথায়, শরীরে মারাত্মক আঘাত হেনেছিল। অবশেষে তাকে মৃত ভেবে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু খলিলুর রহমান মরেননি। তবে সেটা ছিল তার প্রথম মৃত্যু। তিনি বেঁচে উঠেছিলেন।
যে যুদ্ধে গ্রামবাসীর আক্রমনে পরাস্থ হয়েছিল ক্যান্টনমেন্ট ও হানাদার বাহিনী। যারা যুদ্ধে ধর্ষন অস্ত্র প্রয়োগের জন্য প্লট হিসাবে বেছে নিয়েছিল দিঘারকান্দা গ্রামকে।
সেই সম্ভাব্য ধর্ষনযজ্ঞকে নস্যাৎ করে ধর্ষনোদ্যত হানাদারকে চরম শিক্ষা দিয়েছিল গ্রামবাসী। যেখানে প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন দিঘারকান্দার সাহসী নারীরা।
সে রাতে তারাও হয়ে উঠেছিল একেকজন তারামন বিবি। একেকজন নারী মুক্তিযোদ্ধা। আত্মরক্ষার্থে তরুনী, যুবতী,গৃহবধু, মহিলারা সে রাতে হয়ে উঠেছিল বিদ্রোহীকন্যা। রণরঙ্গিনী। ‘ যার যা ছিল-ঝাটা, হলঙ্গা, পিড়ি, মাছ কাটার বটি দা, রাম দা, খন্তি, বল্লম তাই নিয়ে সশস্ত্র পাকসেনাদের উপর আক্রমন রচনা করেছিল। সেই নারীরা সেইরাতে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিল।
নাজিম উদ্দিনের বউ গোলপজান হয়ে উঠেছিল ইতিহাসের ‘ওমরও জান’। লেবু মন্ডলের বউ মুকুতুন্নেসার হাতে দেশীয় অস্ত্র ঝলসে উঠেছিল। যেন সুলতানা রাজিয়ার তলোয়ার।
স্টেনগানধারী পাঞ্জাবীদের ২ জওয়ান গোলাপজান ও মুকুতুন্নেসার ‘শাবলের ঘাই’ এর আঘাতে ধরাশায়ী হয়। হানাদারদের এই পতন ছিল লজ্জার। কলংকিত যুদ্ধাপরাধীদের ধর্ষন ষড়যন্ত্রের ‘নগদ’ শাস্তি দিয়েছিল গ্রামটির মা -বোনেরা। ১০/১২ জন পাকসেনার ২ জনকে হত্যা ও ৩ জনকে আহত করে গ্রামবাসী। বাকীরা পালায়। আর সেদিন, দিঘারকান্দায় হানাদার বিরোধী এই ‘মুক্তিযুদ্ধটি’ ছিল গ্রামবাসীর পরিকল্পনা। গ্রামের মানুষজন ছিলেন স্বাধীনতার পক্ষে। বয়স বা অন্যান্য কারনে ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার শ্রেষ্ঠ সময় তার’ এর সূত্রে যাদের মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া হয়নি; তারই এক সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।
যেখানে কৌশল ছিল প্রতিরোধ। কৌশল ছিল আক্রমন হলে পাল্টা আক্রমন। ‘ডু অর ডাই’। সচেতন মুরুব্বীদের পরামর্শে একদল সচেতন যুবক প্রস্তুত ছিল। তাদের চেতনায় ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনা তাদের জানা ছিল এবং হানাদার বর্বর পাকি সেনাদের বিরুদ্ধে তারা জেগে উঠেছিল।
রাত জেগে জেগে তারা গ্রাম পাহারা দিত। ‘বস্তিওয়ালা জাগো’ আওয়াজ তুলে নিজেদের প্রস্তুত রাখছিল। এবং ১৭ জুন ১৯৭১। শুক্রবার রাত। গ্রামবাসী ঝাপিয়ে পড়েছিল হানাদারদের ওপর।
পুরুষরা হানাদারদের ঘিরে ফেলেছিল। আর নারীরা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল। দিঘারকান্দার সেই জনযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়।
সেই যুদ্ধের ওরা ৬ জন। বীর বাঙ্গালি। ১৭ জুন যারা জীবন বাজী রেখেছিল। সম্মুখ সমরে শত্রুসেনাদের হতাহত করে পিছু হটিয়ে দিয়েছিল। বিজয় গর্বে সেদিন তারাও ছিল উচ্ছ্বাসিত। ‘ডুবি বাড়িতে’ অবস্থানরত ১০/১৫ জন নারীর ইজ্জত রক্ষা করেছিল। কিন্তু সেই রাতে গ্রামবাসীর নিরাপত্তার প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠেছিল।
২ পাঞ্জাবী সৈন্যকে হত্যা ও ৩ জনকে আহত করার পরবর্তী সম্ভাব্য পরিনতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন গ্রামবাসী। তারা দ্রুত নিরাপদ স্থলের সন্ধানে আত্মগোপন করেন। স্বেচ্ছা নির্বাসিত হন।
আর সেই রাতেই ওই যুবকরা নিহত ১ পাক সেনার লাশ টেনে হিচড়ে দেড় কিলোমিটার দুরে নিয়ে মাটিচাপা দিয়ে গুম করেন।
পরদিন ‘পাগলা কুত্তার’ মতো পাকসেনারা গ্রামে ঢুকে। ‘ মানুষ না মাটি’ চাই বলে অগ্নিসংযোগ করে গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। আক্রোশে বারবার গুলি ছুড়তে থাকে। ভীতিকর অবস্থা। গোটা গ্রাম শ্মশানে পরিনত হয়।
এর মধ্যে গ্রামটিতে পড়ে থাকে বদির লাশ। তারপর ঝুকির মধ্যেও লাশের দাফন হয়। দৃশ্যমান এ কাজে অংশ নেয়াই কাল হয় খলিলুর রহমানের। টার্গেট আর সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দুতে পড়ে যান তিনি।
সবাই মনে করেছিলেন, পাকিস্তানীরা তাকে মেরে ফেলেছে। চরম নির্যাতন করেছে। অমানবিক, পাশবিক, ভয়াবহ, বর্বর নির্যাতন। নির্যাতিত খলিলুর রহমানের আত্মচিৎকারে কেপে উঠেছিল এলাকা। তার আর্তনাদে বাতাস স্তব্ধ হয়ে যায়। দিঘারকান্দায় সেদিন ছিল ভয়াবহ একটা দিন। সেদিন ছিল একটা ভয়াল দিবস।
ভার্সিটিতে ছিল হানাদারদের ক্যাম্প। তার ভেতর টর্চার সেল। সেখানেই চলছিল লোমহর্ষক নির্যাতন। আর বন্দী খলিলুর রহমান নির্যাতনের যন্ত্রনায় ছটফট করছিলেন। নির্মম, নৃশংস, চরম নির্যাতন। অসহ্য নির্যাতনে বারবার জ্ঞান হারান খলিল। অজ্ঞান অবস্থাতেও বিরাম ছিল না। উপর্যুপরি নির্যাতন। খানসেনাদের একটা দল পালাক্রমে তাকে মারছিল।
খলিলুর রহমানের উপরকার নির্যাতনের মাত্রা ছিল চরম ভয়াবহমাত্রায়। পাকসেনাদের আক্রোশ তার বিরুদ্ধেই। প্রতিশোধের নেশায় ওরা উন্মুত্ত।
ইচ্ছা করলে এক গুলিতেই খতম করে দিতে পারতো। না হলে ব্রাশ ফায়ারে ঝাঝরা করে দিতে পারতো। চোখে কালো কাপড় বেধেঁ ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করতে পারেতো। কিন্তু খলিলুর রহমানের ক্ষেত্রে সে শাস্তি যেন যথেষ্ঠ নয়। কঠিন শাস্তি। তিলে তিলে মৃত্যুযন্ত্রনা দিয়ে তাকে শেষ করাটাই যেন ছিল উদ্দেশ্য। ভয়ংকর পৈশাচিকতা চলে তার উপর।
সেই দৃশ্য দেখে ঠিক থাকতে পারে না কেউ। অন্য নির্যাতিতরা পর্যন্ত নিজের অসহ্য যন্ত্রনা ভুলে যায়। চোখের সামনের সেই অমানষিক নির্যাতন সবার মনে মৃত্যুভীতি এনে দিয়েছিল। আর মৃত্যু যেন ভুলে গিয়েছিল খলিলকে। মরণঘাতী নির্যাতন। ওমন নির্যাতনে কেউ বাঁচে না। মুমুর্ষ খলিলুর রহমান। তার জন্য মৃত্যুদন্ডই ঘোষনা করেছিল হানাদাররা। বলছিল ‘এরা হচ্ছে মুক্তিবাহিনীর লোক। এরাই মেরেছে। একে খতম করে দেবো। যেন আর কেউ সাহস না পায় পাঞ্জাবীদের মারতে।’ উর্দুভাষায় ছিল সেই হুংকার। সেনা ক্যাম্পে সালাম, হেলিম, রহিম, মনাই, জবেদ আলীরাও নির্যাতনের স্বীকার হয়েছিলেন।
প্রেক্ষিত দিঘারকান্দা ১৯৭১
দিঘারকান্দা। মহান মুক্তিযুদ্ধের এক উপাখ্যান। ময়মনসিংহ জেলা সদরের বয়ড়া ইউনিয়নের গ্রামটির পাশেই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে এপ্রিল মাসের শেষ দিকে হানাদার বাহিনী অস্থায়ী ক্যান্টনমেন্ট গড়ে তুলেছিল। মাত্র ২ মাস পরই দিনটি ছিল ১৭ জুন। শুক্রবার। দিঘারকান্দা পুরাতন ডুপিবাড়িতে ২ পাকসেনাকে হত্যা করে এলাকাবাসী। পাকসেনা হত্যার এই ইতিহাস ‘দিঘারকান্দা জনযুদ্ধ’ নামে খ্যাত। ক’জন ‘অজানা মুক্তিযোদ্ধার’ খন্ডযুদ্ধ সেটি। যে যুদ্ধে গ্রামের যুবক শ্রেনীর পাশে নারীর অংশগ্রহন ও ভূমিকার ইতিকথাও আজ এক কিংবদন্তি। মুক্তিযুদ্ধের গল্প।
এ ব্যাপারে বীর মুক্তিযোদ্ধা বিমলপাল ‘মুক্তিযুদ্ধ: ময়মনসিংহ- দিঘারকান্দার জনযুদ্ধ’ নিবন্ধ লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের গল্পের ফেরিওয়ালা হিসাবে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি মুক্তিযুদ্ধের যে গল্প বলেন- সেখানে ‘দিঘারকান্দার যুদ্ধ’ ইতিহাস বয়ান করেন।
ময়মনসিংহের মুক্তিযুদ্ধের গবেষক, সাংবাদিক লেখক, মাটি ও মানুষ এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আশিক চৌধুরীর লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধে ময়মনসিংহ-১৯৭১’ গবেষনায় দিঘারকান্দার সেই মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ও বীরত্বগাঁথা বিধৃত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে যা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
সম্প্রতি, দিঘারকান্দা যুদ্ধ ইতিহাসের প্রামান্য তথ্য ও ব্যাটেল স্টাডি-সংগ্রহে মাঠে নামেন সাংবাদিক গবেষকদের একটি দল। সরজমিনে তারা কথা বলেন একাত্তরের প্রত্যক্ষদর্শী ও ওয়াকিবহাল মহলের সাথে।
মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত খলিলুর রহমানের সন্তান দৈনিক মাটি ও মানুষ সম্পাদক প্রকাশক একেএম ফখরুল আলম বাপ্পী চৌধুরী। সাংবাদিক লেখক স্বাধীন চৌধুরী, মাটি ও মানুষ বার্তা সম্পাদক বিল্লাল হোসেন প্রান্তকে সাথে নিয়ে তিনি দিঘারকান্দা জনযুদ্ধের স্বরূপ, বাস্তবতা, পটভূমি ও প্রভাব সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধান করছেন।
দিঘারকান্দা ডুপিরবাড়িতে পাকসেনা খতম ও এর জের ধরে এলাকার যুবকদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করে হানাদাররা। যা নির্যাতনের নির্মম বেদনার বিস্তর কাহিনী আর ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধকালীন বীর জনতার এই যুদ্ধ-এক অসামান্য কাহিনী। জনযুদ্ধ।
এ নিয়ে কথা বলেন, সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সেদিনের তরুণ যুবকদের সাথে। যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: গিয়াস উদ্দিন, নাট্যকার ও অভিনেতা মো: হারুন মিয়া, দিঘারকান্দা ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান মো: আব্দুল মালেক। তাদের স্মরনে আছে একাত্তরের স্মৃতি। যা কোন দিন ভোলার মত নয়। তাদের স্মৃতি কথায় উঠে আসে ডুপিরবাড়িতে সেই রাতের ভয়াবহ যুদ্ধের কথা।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অনেক ঘটনা রয়েছে। অনেক যুদ্ধ জনযুদ্ধ। যা মুক্তিযুদ্ধের পরিপুরক। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে যার অধিকতর মূল্যায়ন হওয়া বাঞ্চনীয়। কেননা, জনযুদ্ধও গুরুত্বপূর্ন। প্রকৃত প্রস্তাবে যা মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গ। পাকসেনাদের ক্যান্টনমেন্টের পাশের গ্রামবাসী আক্রমন চালিয়ে পাকসেনাদের হতাহত করেন। এবং যুদ্ধের পরবর্তী ভয়াবহ দিনগুলোতে তারা হুমকি ও ঝুকির মুখেও নিজ এলাকায় ছিলেন। হানাদার বাহিনীর উপর আক্রমনের দায়ে দিঘারকান্দার ৬ যুবক মৃত্যুর মুখে পড়েন। নির্যাতিত হয়েও তারা বেঁচে গিয়েছিলেন। তাদের সাহস এবং বীরত্ব মূল্যায়নের দাবি রাখে। যা সামগ্রিক অর্থে মুক্তিযুদ্ধই।
সেই যুদ্ধবীরদের কথা সচেতন মহল স্মরণ করেন।‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তাদের কিভাবে মূল্যায়ন করবে-তা তাদের অজানা।’ কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে দিঘারকান্দার অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। যোগ করেন স্থানীয় সচেতন মহল।
মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তিতে নির্যাতিত খলিলুর রহমান পিতা- কাছম আলী মুন্সী, আব্দুস সালাম পিতা- আইন উদ্দিন মন্ডল, মো: আব্দুল বারেক পিতা- ছফর উদ্দিন মন্ডল, গিয়াস উদ্দিন পিতা- নেকবব আলী, মো: হারুন মিয়া পিতা- আলাউদ্দিন মাষ্টার, আব্দুর রহিম পিতা- আব্দুর গফুর, মনাই মিয়া পিতা-অজ্ঞাত, জবেদ আলী পিতা-অজ্ঞাত, আজমত মুন্সী পিতা- হবি শেখ, নাজিম উদ্দিন, ইয়াকুব আলী, কুদ্দুছ, জুলু, কাবিল, কাশেম, লতিফ, আলাল এর নাম অমর হয়ে থাকবে।
যেমন অমর হয়ে থাকবেন শহীদ রহমত আলী ওরফে বদি মিয়া। হানাদারদের মারতে গিয়ে সম্মুখ যুদ্ধে যিনি গুলিবিদ্ধ হন। ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন গোলাপজান ও মুকুতুন্নেসার নাম। যারা-আগ্নেয়াস্ত্রধারী ২ পাকসেনাকে শাবলের ঘাই মেরে হত্যা করেছিলেন। এই দুই বীর নারী মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিলেন।
পাক সেনাদের ক্যাম্পে চরম নির্যাতিত হয়েছিলেন-খলিলুর রহমান, আব্দুস সালাম, হেলিম মিয়া, আব্দুর রহিম, মনাই মিয়া, জবেদ আলী। মুক্তিযুদ্ধে স্বত:স্ফূর্ত অংশ নিয়ে এরা দিঘারকান্দায় পাকসেনাদের ঘেরাও করেছিলেন। নারী-পুরুষ মিলিত ভাবে আক্রমন চালিয়ে পাকসেনাদের খতম করেছিলেন। লাশ গুম করেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস অবরুদ্ধ জনপদে থেকেও তারা পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তারা বিজয়ী হয়েছিলেন। হানাদারদের ক্যান্টনমেন্টের পাশের এলাকায় একখন্ড স্বাধীন, মুক্ত অঞ্চলে পরিনত করেছিলেন দিঘারকান্দাকে। পাকসেনা হত্যার ঘটনায় হিং¯্র হানাদাররা দিঘারকান্দাকে তছনছ করে ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু বাকী দিনগুলোতে ওরা সাহস পায়নি গ্রামটিতে প্রবেশের।
সুতরাং শুধু শহীদ বদি মিয়া বা নির্যাতিত ৬ জনযোদ্ধা, গুলিবিদ্ধ ২ যুবক ও ২ সাহসী নারীসহ দিঘারকান্দা গ্রামের নারী-পুরুষ যুদ্ধের দিনগুলোতে যে ইতিহাস গড়েছেন তা অবিস্মরনীয়। হানাদারদের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীর যুদ্ধজয় আসলেই ঐতিহাসিক ঘটনা।
ডুপিরবাড়ি ব্যাটেল ফিল্ড
দিঘারকান্দার ডুপিরবাড়ি। অবস্থানগত কারনে বাড়িটি ছিল ঝোপঝাড়, জংলার ভেতর। সামনে পুকুর। রাস্তা অনুন্নত। অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বিবেচিত হওয়ায় রাতের বেলায় তরুনী, যুবতী ,গৃহবধুরা এই বাড়িতে এসে আশ্রয় নিত। হানাদারদের হাত থেকে বাঁচতে এলাকার নারীদের লুকিয়ে রাখতে হতো। অত্মগোপনে থেকেও প্রতিনিয়ত ভয়ের মধ্যে থাকতে হতো নারীদের। আতংকগ্রস্থ দিনরাত একাকার। সে এক ভয়াবহ অবস্থা।
একাত্তরে পাকসেনারা কৃষি ভার্সিটিতে ক্যাম্প করায় কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন দিঘারকান্দা গ্রামবাসী। হানাদারদের ভয়ে অনেকেই এলাকা ছেড়ে দুরে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নেন। আর যারা গ্রামে ছিলেন তারা প্রতিনিয়ত ছিলেন শংকিত।
সবচেয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল মেয়েদের নিয়ে। তাদের গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখতে হতো। আর গ্রাম ও নারীদের নিরাপত্তায় লোকজন গোটা এলাকায় নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্ঠনী গড়ে তুলেছিল। যুদ্ধের উত্তাপে বিপন্ন গ্রাম ছিল দিঘারকান্দা।
একসময় এলাকার মুরুব্বীরা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। এবং যুবকদের পথে ঘাটে সর্তক অবস্থান নিতে বলেন। রাতের বেলায় দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তারা ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থেকে, এলাকা পাহারা দিত। তাদের একটা দল নাইটগার্ড হিসেবে সারারাত জেগে থাকতো। শত্রুসেনাদের গতিবিধির উপর তীক্ষ্ম নজর রাখতো। বিপদ এলে ‘বস্তিওয়ালা জাগো’ বলে সংকেত দিত।
প্রত্যক্ষদর্শীদের কথা
এদিকে কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্প থেকে পাকসেনারা এসে মাঝে মাঝেই গ্রামে ঢুকে পড়তো। বিভিন্ন বাড়িতে ঢুকে যুবতী মেয়ে খুজতো। এলাকার মা বোনদের উপর জঘন্য বর্বর নির্যাতন চালানোর চেষ্টা করতো। দিনে মেয়েদের না পেয়ে প্রায় রাতেও এলাকায় হানা দিতো। রাতজাগা এলাকাবাসীর কৌশলগত প্রতিরোধে তারা সফল হতে পারতো না। ফলে এলাকার নিরীহ মানুষের পেছনেই যারপর নাই অত্যাচার-জুলুম এর নেশায় লেগে থেকেছে হানাদাররা।
পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছিল। এ অবস্থায় গ্রামবাসী সিদ্ধান্ত নেয়-‘হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে সর্বাত্মক যুদ্ধ করা হবে। মরার আগে শত্রুসেনাদের মারতে হবে।’ মহিলাদেরও বলে দেয়া হয় আক্রান্ত হলেই মুহুর্তেই আক্রমন। ফলে গ্রামবাসীর মধ্যে এক ধরনের যুদ্ধ যুদ্ধ উত্তেজনা কাজ করছিল। হানাদারদের বিরুদ্ধে গ্রামটি শক্ত মানসিক অবস্থান নেয়।
তারপর এলো সেই ভয়াল ১৭ জুন। শত্রুসেনাদের গুপ্তচররা খবর পৌছে দিয়েছিল। ডুপিরবাড়ির গহীন অরণ্যের ভেতরেই সচরাচর লুকিয়ে থাকে গ্রামের নারীরা। বিকেলে এক খানসেনা এলাকা রেকি করে যায়। যা এলাকার যুবকদের চোখ এড়িয়ে যায়নি। মেয়েদের অন্যত্র সরানোর সুযোগও ছিল না। ফলে সম্ভাব্য বিপদ আঁচ করতে পেরে সকলেই প্রস্তুত হয়ে থাকে। গ্রামের নিরাপদ অবস্থানের কয়েকটি বাড়িতে অধিকাংশ নারীদের সরিয়ে নেয়া হয়। তারপরও অন্তত: ১৫ জন যুবতী সে রাতে ছিলেন ডুপিরবাড়িতে।
রাত নেমে আসার পর ১৫/২০ জনের একটি দল সরাসরি এসে ডুপির বাড়ির জঙ্গলে ঢুকে। রাত তখন ১২টা। তারা ‘ যুবতী মেয়ের’ সন্ধানে উন্মত্ত হয়ে পড়ে। সে সময়ে কৌশল মোতাবেক এলাকার যুবকদের একটি দল সর্তক হয়ে উঠে। ডুপির বাড়ির চারিদিকে অবস্থান থেকে তারা পাকসেনাদের ঘিরে ফেলে।
দুই পাকসেনা একটি অন্ধকার ঘরে ঢুকে পড়ে। মেয়েদের পেয়ে ধরতে যায়। সে সময়েই শাবলের আঘাত। মরণ চিৎকার দিয়ে এক পাকসেনা ঘটনাস্থলেই মরে যায়। অন্য হানাদার ঘর থেকে দৌড়ে পালাতে গেলে মহিলারা তার উপর দা, লাঠি, ঝাড়–, বল্লম- যার হাতে যা ছিল সেটা নিয়েই হামলা চালায়। পলায়ন উদ্যত পাকসেনা গুরুতর আহত হয়। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এসময় আরো ৩ জন পাকসেনাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে মেয়েরা। পাকসেনাদের উপর নারীদের হামলার সাথে সাথে গোপন অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসে যুবকরা। হৈচৈ করে ধাওয়া করে। তাদের সবার হাতে রামদা, বল্লম। দেশীয় ধারালো অস্ত্র।
অবস্থা বেগতিক দেখে বাকী পাকসেনারা দ্রুত এলাকা ছাড়ে। কেউ কেউ অস্ত্রশস্ত্র ফেলে পালিয়ে যায়। কেউ কেউ যাবার সময় এলোপাথাড়ি গুলি বর্ষন করতে থাকে। গুলির শব্দে প্রকম্পিত হতে থাকে গ্রামটি। এ সময় রহমত আলী ওরফে বদি মিয়া এক হানাদারকে বল্লম দিয়ে আঘাত করেন। হানাদাররা ব্রশফায়ার করে। গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন বদি মিয়া। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন নাজিম উদ্দিন ও আজমত মুন্সী। যুদ্ধাহত এই দু জনযোদ্ধা অল্পের জন্য বেঁচে যান।
হিং¯্র হানাদারদের গুলির মধ্যেও সে রাতে এলাকার নারী পুরুষ হয়ে উঠেছিল মুক্তি পাগল। ক্যান্টনমেন্টের পাশের গ্রামবাসীর এই ‘অভ্যূত্থান’ হানাদারদের মনে ভয় ধরিয়ে দেয়। সেই রাতে তারা আর গ্রামে ঢুকার সাহস পায়নি।
এদিকে, নিহত পাকসেনার লাশ গ্রামবাসী টেনে হিচড়ে ১ কিলোমিটার দূরে নিয়ে মাটিচাপা দেয়। পরদিন খানসেনারা গ্রামে ঢুকে নিহত সৈনিকের লাশের খোঁজে ব্যাপক তল্লাশী শুরু করে। শুরু হয় ব্যাপক নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, তান্ডবলীলা।
এদিকে, সর্তক গ্রামবাসী প্রাণ ভয়ে সরে যাওয়ায় এলাকা জনশূন্য হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ডুপির বাড়ির পুকুরপাড়ে পড়ে থাকে শহীদ বদির লাশ।
পরদিন লাশ দাফনে এগিয়ে আসে ৬ যুবক। দাফনের পর হানাদাররা তাদেরকে অস্ত্রের মুখে ধরে নেয়। নিহত পাকসেনার লাশের সন্ধানে তাদের উপর শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদে নামে নির্মম নির্যাতন।
সেসময়ে যুদ্ধবন্দী যুবকদের উদ্ধার করতে মুরব্বীরা যোগাযোগ করে হানাদারদের ২ দোসর আব্দুল হান্নান ও মেহেদী খানের সাথে। যুবকদের ছেড়ে দেয়ার শর্তে লাশের সন্ধান দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়।
হানাদারদের দোসর হলেও হান্নানরা সেদিন এলাকার স্বার্থে ও সেন্টিমেন্টকে গুরুত্ব দেয়। তারা টর্চার সেলে যায়। এবং কৌশলে পানি আনার কথা বলে একেকজনকে পালিয়ে যাবার সুযোগ করে দেয়। কিন্তু খলিলুর রহমানকে হানাদাররা ছাড়েনি। তার উপর চালায় ভয়ংকর নির্যাতন। অবশেষে তাকে মৃত ভেবে ক্যাম্পের বাইরে ফেলে দেয়।
পরিবারের সদস্যরা রাতের অন্ধকারে লাশ আনতে গিয়ে দেখেন খলিলুর রহমানের দম আছে। মৃতপ্রায় বিধ্বস্ত দেহের খলিলুর রহমান আল্লাহর কৃপায় বেচেঁ যান। কিন্তু পাকসেনাদের নির্মম নির্যাতনের ভয়াবহ যন্ত্রনায় আমৃত্যু তিনি ছিলেন নির্যাতনের ভয়াবহ যন্ত্রনায়। আমৃত্যু তিনি ছিলেন অসুস্থ। কখনো কখনো মানসিক ভারসাম্যহীন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এই অব্যক্ত বীরত্বগাঁথা চির অম্লান।

 

সর্বশেষ খবর



এ বিভাগের অন্যান্য খবর



আমাদের সঙ্গী হোন

যোগাযোগ

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় –

বাসা#৪৯, রোড#০৮, তুরাগ, ঢাকা।
বার্তা কক্ষ : 01781804141
ইমেইল : timesofbengali@gmail.com

 

© এ.আর খান মিডিয়া ভিশন এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান

      সর্বস্বত্ব স্বাত্বাধিকার টাইমস্ অফ বেঙ্গলী .কম

কারিগরি সহযোগিতায় এ.আর খান হোস্ট