প্রকাশিত : Mon, Dec 18th, 2017

শেষ বিকেলের মেঘ- মৃত্যুঞ্জয় সরদার উচ্ছ্বাস (পার্ট-৭)

বন্ধুরা তার দিকে রহস্য ভরা চোখে তাকাতে তাকাতে হাঁটতে থাকলো।
এই জায়গাটা রহস্য ঘেরা। প্রকৃতির যে রুপ তা এখানে আসলে অবলোকন করা যায়। এক সময় আমরা কোন জগতে ছিলাম। আমাদের জীবন জীবিকা কেমন ছিল। আঁচ করা যায় মানুষ আদিম কালে কেমন ছিল। প্রকাশ্যে তার গোপন জীবন চরিতার্থ করত এখন এযুগে এসে তার কিছু প্রতিছব্বি দেখা যায় টিন এজ দুইটা ছেলে-মেয়ে এক অপরকে চুমু খাচ্ছে। বিষয় টা তাদের চেহারা ও ড্রেস আপ দেখে আন্দাজ করা যায়। পৃতি বললো,মলি তুই আমায় কোথায় নিয়ে আসলি। মলি হেসে বললো,তুই যেন ঢাকা শহরে এই নতুন! এটাই তো যুবক যুবতিরদের পবিত্র স্থান,দেখছিস কেমন খেলা চলছে। বুচ্ছি তো আদিম যুগের কিছুটা ছোঁয়া এখানে এসে পরখ করা যায়। মলি আরো একটু রঙ্গ রসে বললো, তুই মনে হয় একটু ও তোর স্বামির কাছ থেকে এই আদিম ছোঁয়া পাসনি? একটুও না সে সিচুয়েশন আমি কখনও মেক করতে দেইনি,গাম্ভীর্য্যওে সাথে উত্তর দিল পৃতি। বালতি ভরা গোলাপ থেকে একটা গোলাপ সামনে এনে একটি ৬/৭ বছরের ছোট্ট মেয়ে বললো, আপু একটা ফুল নেন আপনার বয় ফ্রেন্ডকে দেবেন। পৃতি অবাক হয়ে গেল মেয়েটার কথা শুনে,সে বিস্ময় কর ভাবে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বললো,আমার যে বয় ফ্রেন্ড আছে সেটা তুমি বুঝলে কি করে? মেয়েটা বললো, আপা এখানে যারা আসে তাদের বয় ফ্রেন্ডের সাথে আসে আবার সাথে না আসলে ও দেখা করতে আসে। পৃতি বললো, আমার কোন বয় ফ্রেন্ড নেই নেব না ফুল। মেয়েটিকে ফিরিয়ে দিল পৃতি। পৃতির কথা শুনে অবাক হল বান্ধবীরা । কোন সময় কোন কথা বলছে ও মনে হয় নিজেই জানেনা মনে মনে বললো মলি। মলি বললো,নে’না একটা ফুল। মেয়েটি আবার বললো এই ফুল টি আপনার জীবনের ভুলটি শুদ্ধ করে দিতে পারে। নেন না ফুলটি। মেয়েটির কথা শুনে হতবাক হয়ে গেল পৃতি। কিছুক্ষন মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকলো হ্যাঁ না কিছু বললো না। শুধু বললো কত তোর ফুলের? ১০ টাকা,মায়া ভরা চোখে বললো মেয়েটা। ১০ টাকা দিয়ে ফুল নিয়ে ভ্যানেটি ব্যাগে রাখল পৃতি। কিছুদূর যেতেই শহীদ জিয়ার মাজারের পুব কর্ণারে একটি ছেলেকে লক্ষ করল পৃতি। ছেলেটির পাশে একটি মটর সাইকেল দাঁড় করানো। দেখে মনে হয় এই মানুষটি কার অপেক্ষায় চাতক পাখির ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটার বুকটা যেন শুকনা মরুভূমি। শুধু বৃষ্টির দরকার। যে বৃষ্টিতে তপ্ত মরুভুমি ঠান্ডা হবে বুঝি। ছেলেটার চুলগুলো রুক্ষ এলোমেলো। ছেলেটা আর কেহ নয় রকি। শুকনা চেহারায় পৃতি প্রথমে চিনতে পারলোনা যে এটা রকি। কাছে যেয়েই হাত দুয়েক সামনে দাঁড়িালো পৃতি এবং দৃষ্টি পতিত হল রকির চোখের দিকে। অপলক নয়নে তাকিয়ে আছে রকি। এমন ভাবে তাকিয়ে আছে মনে হয় এই মেয়েটিকে সে আগে কখন ও দেখিনি। এই প্রথম দেখছে তাকে । চোখের চাহনি টা এমন মায়া ভরা যে অতি সহযেই যে কাউকে কাছে টানতে পারে। ভালবাসতে পারে আমৃত্যু। রকির দিকে তাকিয়ে সব কিছু ভুলে গেছে পৃতি। ইচ্ছে করছে ঐ তৃষ্ণাত্ব বুকে এক ফোটা জল হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে। ভাবনাটা নিজের ভিতর নিবৃত রাখার প্রয়াস ব্যাক্ত করল। নিঃশব্দ মুখে দুবাহু তুলে ধরল রকি। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না পৃতি। সকল ভাবনার অবসান ঘটিয়ে এক ফোটা জল হয়ে মিলে গেল ঐ তৃষ্ণাত বুকে। শুকনো সাগর আজ যেন তার বারি ফিরে পেয়েছে। চারিদিকে বাতাস মৃদু সুরে বওয়া শুরু করেছে,অফুটান্ত ফুল গুলো কিসের অপেক্ষায় ফোটা থেকে বিরত ছিল, তারা যেন ফুটতে শুরু করেছে। তারা যেন এই দিন টার জন্য অপেক্ষা করছিল। এত দিন পর পাখিরা কিচির মিচির শুরু করেছে। তাদের কাছে মনে হচ্ছে তারা এত দিন কোন জালে বন্দি ছিল সেখান থেকে তারা মুক্তি পেয়েছে। চারিদিকে আকাশে বাতাসে যেন আনান্দের সুর ধ্বনি ভেসে আসছে। যাহা বড়ই সুমধূর। বুকেতে বুক মিলিয়ে আছে দীর্ঘক্ষন, মুখের মাঝে তাদের নিরবতা। কোন আবেগে আপ্লুত হয়ে পৃতি তার বাহু আরও জোরে চেপে ধরল রকিকে। গভীর ভাবে লুকায়ে গেল রকির বুকের ভিতরে। সে ভুলে গেল সে এখন আদিম যুগে না কোন যুগে আছে। বান্ধবীরা অপলক ভাবে তাদের বন্ধন দৃষ্টিগোচর করতে লাগলো। এমন সময় রকির চোখ থেকে একফোটা জল গড়িয়ে পড়ে পৃতির পিঠে। উষ্ম রান্না করা কড়াতে যদি হঠাৎ যদি পানি পড়ে,তখন যেমন স্যাৎ করে একটি শব্দ হয় ধোয়া উড়ে যায় নীল আকাশে। তেমনি যেন স্যাৎ করে উঠল পৃতি। মুখ দিয়ে নিঃসৃত ধোয়ার নেয় গরম হাওয়া বের হয় পৃতির মুখ থেকে। বুক থেকে বুক সরিয়ে রকির চোখের পানে চায় পৃতি। তার চোখ দিয়ে তার জল গড়িয়ে পড়ছে। ঠোঁট টা আবেগে থরথর কাঁপছে। পৃতি আবেগে আরো আপ্লুত হয়ে গেল, আবার জড়িয়ে ধরে রকিকে। এই কেবলই রকি মুখ দিয়ে একটা বাক্য উচ্চারন করল, তোমার জন্ম শুধু আমার জন্য। আমি তোমায় ছাড়া কিছুই ভাবতে পারিনা। বান্ধবীরা তাদের আলিঙ্গনে মুগ্ধ হয়ে আর একটু সুযোগ করে দেওয়ার জন্য একটু দূরে সরে দাঁড়ালো। রকি মধুর আলিঙ্গনে চুমু এঁকে দিল পৃতির কপালে। জীবনে প্রথম বারের শরীরে কোন পুরুষের চুমুর পরশ। লজ্জাবতী গাছের পাতার মত তার শরীরের সমস্ত লোম খাড়া হয়ে গেল। সারা শরীর দূর দূর কাঁপতে শুরু করেছে। কিসের একটা তাড়ানা শরীরের ভিতর দিয়ে নদীর ¯্রােত প্রবাহের মত তরঙ্গ খেলে চলেছে। রকি যখন তাকে আরো একটু শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। তখন তরঙ্গ আরো দ্বিগুন বেগে প্রবাহিত হতে থাকলো। হয়ত এই ¯্রােতে কিছুর একটা আঘাত পেলেই নদীর বাঁধ ভেঙে গিয়ে উপসে পড়বে তার ¯্রােত ধারা। আবেগ আপ্লুতে সবুজ ঘাসটার উপর বসে পড়লো দুজন।
কে কাকে কি বলবে তার কোন ভাষা দুজনের মুখে আসছে না। চাতক পাখির মত আবার ও রকি পৃতির মুখের দিকে তাকায়ে আছে। এবার যেন পৃতি লজ্জা পেল। নাথা নোয়াতে নোয়াতে পৃতি বললো,অমন করে কি দেখছো? রকি কোন কথা না বলে ধাম করে পৃতির কোলে শুয়ে পড়ল । ছল ছল নয়নে তাকিয়ে আছে পৃতির চোখের দিকে। পৃতি তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলোনা। লাজুক ভরা হাসিতে চোখ ফিরায়ে অন্য দিকে চাইলো। হঠাৎ তার চোখে পড়ল দূর হতে একটা মহিলা হেঁটে আসছে। যে মহিলা টি দেখতে কিছুটা তার বড় বোনের মত। কিন্তু মহিলা টি একটু ভারি। মহিলাটি যতই কাছে আসছে ততই পৃতির মন আদিম যুগ থেকে একাবিংশ যুগে ফিরে আসছে। পৃতি যেন নিস্তব্দ হয়ে গেল। হঠাৎ যেন পাহাড় হতে একটা পাথর তার বুকে এসে বিধল। কোথা থেকে ঝড় – বাতাস এসে যেন তার খেলা ঘর টি ভেঙে চুরমার করে দিয়ে গেল। গেয়ে যাওয়া পাখির কন্ঠে তীর এসে বিধল। ফুল গুলো অঝরে ঝরে পড়তে লাগল। পৃতি যেন অন্য জগতে চলে গিয়েছিল। সে বুঝতে পারিনি সে আবেগ ঘন মুহত্বে জড়িয়ে ছিল। মহিলাটি কাছা কাছি আসলেই সে তার পুরা চেতনা ফিরে পাইল। সে মহিলাটিকে চিনতে পারিনি তবে মহিলাটির আর কিছু ঠিক না থাকলে তার ফিক করে হাসার স্টাইল ও হাঁটার গতি ঠিক তার বড় আপু স্মৃতির মত। তার শরীর টা আগে কাঁপছিল অন্য আবেগে এখন কাঁদছে অন্য আবেগে। মহিলা টি তাদের অতিক্রম করে চলে গেল। রকিকে কে কোল থেকে উঠায়ে দিয়ে এক পাসে সরে বসল।
-কি হল পৃতি ?
-কিছু না।
– হঠাৎ এমন করছো?
– বললাম তো কিছুইনা। আমি যাই।
– আমি যাই মানে,আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা। তোমার কি হয়েছে বল?
না আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে অন্য দিন বলব আমি এখন যাই। তার পর মলি মলি বলে ডাকতে ডাকতে মলিদের কাছে চলে গেল। তাড়াহুড়া করে বললো,চল আমি বাসায় যাব।
তোদের কথা বল শেষ,দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বললো মলি।
হ্যাঁ শেষ চল বাসায় যাব। বলেই পৃতি জোরে জোরে গাড়ীর দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। বান্ধবিরা কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। রকির কাছে কিছু জিগাতে তার ও কোন অপশন পেলনা পৃতির পিছু পিছু হাঁটতে থাকতে লাগলো।
গাড়ীর কাছে আসলে ড্রাইভার দরজা খুলে দিল। সবাই গাড়ীতে উঠে পড়ল। ড্রাইভার বললো,আপা আমরা এখন কোথায় যাব?
-সোজা বাসার দিকে। পৃতির মন মাইন্ড দেখে বান্ধবীরা কিছুই বলার সাহস পেল না। কিছু দূর যাওয়ার পর পৃতি একটু স্বাভাবিক হলে মলি বললো,বলত কি হয়েছে তোর এভাবে চলে আসলি? কিছু কথা বলা যায়না আবেগ আপ্লুত হয়ে বললো পৃতি। শুধু এত টুকু জেনে রাখ ২ দিন পর আমার হাজব্যান্ড আসবে। বান্ধবীরা অবাক হয়ে গেল। মলি বললো,কিন্তু রকি! চুপ,কোন কথা নয়,বলে মলিকে থামিয়ে দিল পৃতি।
আজ রাতে পৃতি মোটেও ঘুমাতে পারলোনা। যখনই রকি কথা, রকির আলিঙ্গনের কথা চোখের সামনে ভেসে ওঠে তখন সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা। ভাবে সব কিছু ছেড়ে দিয়ে রকির কাছে চলে যেতে। আবার যখন মা,বাবা, বড় বোনের কথা মনে ওঠে তখন আর তার কোন কিছু ভাল লাগেনা। মনটা বিষাধে ভরে ওঠে।
*****
ডোনা এসেছে। কথায় বলে টাকায় অনেক কিছু হয় না। মন থাকলে অনেক কিছু হয়ে যায়। মানুষের মত পরিবর্তন হয়। সেরকম পরিবর্তন বুঝি ডোনা হয়েছে। তার চাল চলন হাব ভাব এখন একটু ভিন্ন ধরনের। বলতে গেলে ভদ্র স্বভাবের। তার মনে পরিবর্তন এসেছে সে ভালবেসে পৃতির জন্য অনেক কিছু নিয়ে এসেছে। সে পৃতির রুমে যেয়ে বললো,কেমন আছ পৃতি? আপনি আমার অনুমতি না নিয়ে আমার রুমে প্রবেশ করলেন কেন? ডোনা পরিবেশটা সিথিল করার চেষ্টা করলো সুন্দর করে মধু মাখা কণ্ঠে বললো। হয়ত রেগে যাবে তার পরে ও সত্যি একদিন তোমার রুম আমার হবে আমার রুম তোমার হবে তাই। রাগে রাগে ঠাস করে ডোনার চোখের পানে তাকায়ে পড়লো । আমি আপনার রুম আমার রুম এক করতে চাইনা,এই কথা টি বলতে গিয়েও বলতে পারলো না পৃতি। মাথা নোয়ায়ে ফেলল। জানিনা তুমি আমাকে হয়ত তোমার মন থেকে এখনও মেনে নিতে পারোনি। তবে আমি আগের আমি আর এখন এর আমি এর ভিতর অনেক পার্থক্য। আমি তোমাকে বিয়ে করার পর আর দ্বিতীয় কোন মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাইনি। প্রতিটা মুহুত্ব তোমার প্রতিছব্বি বুকের ভিতর লালন করেছি। বিশ্বাস না হয় এই দেখ। বলে ডোনা তার মানি ব্যাগ হতে পৃতির ছবি বের করার চেষ্টা করলো। পৃতি না দেখার মত করে এক নজর ছবিটার দিকে তাকালো। তাকালো এক নজর স্বামীর মুখ পানে। দেখতে পেলো স্বামীর চোখে আগের সেই ডোনা স্বরুপ রেখা নেই। পৃতি মাথা যখনই নিচু করল তখনই ডোনা বললো,আমি তোমার জন্য অনেক উপহার এনেছি কি নেবে না? পৃতি হ্যাঁ’না কিছুই বললো না। হ্যাঁ এবং না হল +,- = – এর উল্টাটা। এখানে হ্যাঁ না এর মাঝা মাঝি মনে হয় হ্যাঁ,তাই ভেবে ডোনা পৃতির জন্য আনা সব উপহার গুলো পৃতির রুমে রেখে চলে গেল।
রাত্রিতে নানাদিক ভেবে দু চোখে ঘুম আনতে পারল না। তার ইচ্ছা হচ্ছে গলা ছেড়ে কান্না করতে। বার বার রকির সেই আবেক জড়ানো ভালো বাসা তাহার শিহরিত করতে থাকল।কিসের এক প্রতিচ্ছবি তাকে বারেবারে বলছে’তুই কি করে রকিকে ছাড়া থাকবি?কি করে ভুলবি রকির আলিঙ্গনে বাধা সেই ভাল বাসার কথা। যখনই হয়ত ঝরা পাতা ঝর ঝর করিয়া মাটিতে ঝরিয়া পড়ে তখনই প্রেমের মরা ডালে পাতা গজায়।সিদ্ধান্ত হীনতায় ভুগতে লাগলো। আর সহ্য করতে পারলো না সবাই যখন গভীর ঘুমে মগ্ন সে তখন গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করল। ইচ্ছা করছে আত্ম হত্যা করতে। কিন্তু সেটা ও সম্ভব হলোনা। হাজার চিন্তার অবসান ঘটিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করল।
ভোর বেলায় উঠে ভাবল আজ যেভাবে হোক রকির সাথে দেখা করতে হবে । আজকে দেখা হলে আমার সাথে ওর আর দেখা হবে না। যদি দেখা হয় তাহলে সেটা হবে আমার মত্যুর পরে।
*****
আজ দুজন মিলিত হল আফতাপ নগর এর শেষপ্রান্তে কাশফুল ও বালু মাঠে। পৃতি মলিকে ম্যানেজ করে রকির সাথে দেখার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। সেখানে পিজুস সেন বেনুর পরিচালনায় এবং মৃত্যুঞ্জয় সরদার উচ্ছ্বাস এর রচনায় প্রান কোকিলা নামের ধারাবাহিক নাটকে শুটিং চলছে। সেখানে অভিনয় করছেন- ডিবি ইন্সেপ্টকর ডি এ তায়েব ও হুমাইরা হিমু। নাটকের শুটিং চলছে। শুটিং দেখার দিকে একটু মনোনিবেশ করলো রকি। ডি এ তায়েব এবং হুমাইরা হিমুর অভিনয় করছে। মুগ্ধ হয়ে রকি দেখছে। এর ভিতর পৃতি যে কখন এসে দাঁড়িয়ে আছে তা সে জানেনা। আমরা যারা বাঙালী আমরা খুবই সংস্কৃতি মনা কোথায় গান গজল চলতে থাকলে আমরা হাজার কাজ সামনে থাকলে একটুর জন্য পা টা থেমে যায়,মনটা নিবিত্ত হয় অনুষ্ঠানটির দিকে। আর শুটিং এর কথা তো বলার অপেক্ষা রাখে না ।এমন কোন মানুষ দেখা যায় না শুটিং চলতে থাকলে সেখানে একটু ঢু না মারে। কিন্তু পৃতির সে দিকে খেয়াল নেই। ছল ছল নয়নে তাকিয়ে আছে রকির দিকে। তার চাহনির ভাষা বুঝে ওঠা খুব মুশকিল,কোন সময় মনে হচ্ছে সে সারা জীবনের জন্য এক বার দেখে নিচ্ছে আর হয়ত দেখবে না। আবার মনে হচ্ছে হয়ত সারা জীবনের জন্য রকিকে দেখতে এসেছে। মিডিয়ার ভাষায় প্রতিটা ডায়লগ ধরন বা মনের ভিতর লালিত ভাষ্য অনুযায়ী মুখের এক্সপ্রেশন পরিবর্তন হয়। একটু উদাহরনে বলা যায় কারো উপর যদি ক্রোধ জন্মে তাহলে রাগে দুঃখে নিজের চোয়াল টা শক্ত হয়ে যায়। মুখটা রাঙা হয়ে যায়। আবার কারো উপর যদি অভিমান হয় তাহলে দেখা যায় মুখটা ভারি হয়ে যায়। চোখে পানি ছল ছল করে। এবার তো আমারা বুঝতে পারলাম পৃতির মনের ভিতর কি খেলে চলেছে। তার মন কখনও ভাবছে সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে রকির কাছে চিরজীবনের মত থেকে যেতে। আবার মন চাইছে তার এক কাছ থেকে একেবারে বিদায় নিয়ে চলে যেতে।
রকি আচমকা চোখ ফেরাতে চোখ পড়ল পৃতির দিকে। সাথে রকি বাইকের কাছ থেকে উঠে একেবারে পৃতির কাছে চলে গেল। বাম হাত দিয়ে পৃতির মাথা টা বুকের সাথে চেপে ধরে বললো,আরে আমার ময়না পাখি তুমি কখন এলে। কিছু সময় নিস্তব্দ হয়ে রকির চোখের দিকে তাকিয়ে থাকার পর বললো,এই তো কিছু সময় ছাড় মানুষ শুটিং রেখে তোমাকে আমাকে দেখছে,ভেজা ভেজা কণ্ঠে কথা গুলো বললো পৃতি। রকি আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো,তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসেনা। আমি আমার ময়নাকে জড়িয়ে ধরবো তাতে কার কি যায় আসে। দুই পাশে দুই শুটিং চলছে পাবলিক বুঝতেই পারছে না কোন শুটিং টা তারা দেখবে। ক্যামেরার সামনের টা, না পিছের টা। দর্শকের লক্ষ্য করলো ক্যামেরার সামনে ডি এ তায়েব হুমাইরা হিমুরে জড়ায়ে ধরে আছে। ক্যামেরার পিছে রকি পৃতিকে জড়ায়ে ধরে আছে। দেখা গেল ডি এ তায়েবের বুক থেকে হিমু নিজেকে সরিয়ে দূরে চলে গেল,দর্শকেরা দেখল ঠিক তখনই পৃতি রকির বুক থেকে সরে যেয়ে রকির বাইকের কাছে এসে দাঁড়ালো । দর্শক হাতে তালি দিয়ে উঠল। শর্ট এনজি হয়ে গেল। রকি ভাবল এখানে আর থাকা ঠিক হবে না। রকি বাইকে চেপে বসল এবং পিছে পৃতিকে উঠতে ইঙ্গিত করলো। পৃতি উঠে বসলো । গাড়ী হাওয়ার বেগে ছুটে চলল। পৃতির চুল গুলো কালো মেঘের সাথে মিশে যাচ্ছে। খেলা করছে বাতাস ও ওই নীল আকাশের সাদা কালো মেঘ গুলোর সাথে। যদি আর একটা বাইক দিয়ে পৃতির চুলকে সামনে রেখে নীল আকাশের আভা গুলো ধারন করা হয়। তবে একটা রুপ কথার গল্প হবে। আকাশ থেকে নেমে আসা নীল পরীর গল্প। এই পরিবেশে ব্যাক গ্রাউন্ডে যদি ১৯৬১ সালের সপ্তপদী সিনেমাতে মহানায়ক উত্তম কুমার এবং মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের মুখ মেলানো হেমান্ত মুখপাধ্যায় এবং সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় গাওয়া এবং গৌরিপ্রসন্ন মুজমদারের লেখা সেই বিখ্যাত গান“এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হত বলত’’ এই বিখ্যাত গান বাজে তবে কেমন হবে? খুব বেশি ভাল হবে না। কারণ দুজনের রোমান্টিজম এক হচ্ছে না। রকি ফুর ফুরে সেই ১৯৬১ সালের মেজাজে আছে কিন্তু পৃতি আছে বাংলাদেশের নায়িকা ববিতা চরিত্রে। লাইফের অধিকাংশ দিন তার কাঁদতে কাঁদতে গেছে। তারা হাতির ঝিলে মহানগর প্রজেক্ট এর সামনে চলে আসলো। অনেক সময় পৃতি কিছু বলছে না,চুপ চাপ বসে আছে। কিছুটা উদাসিন।
-কি হল তোমার মুড অফ হয়ে গেল কেন পৃতি?
পৃতি আচমকা কি বলবে না বলবে ভেবে পাচ্ছেনা। তার জীবনের বড় ধরনের ওই ঘটনার কথা কি বলে ফেলবে না বলবে না এই নিয়ে মনের মধ্যে আবার দ্বিধা দ্বন্দে জড়িয়ে পড়ল। চল্লিশ সেরের এই মন কখন যে কি খেলে সে নিজেই জানেনা। সিদ্ধান্ত হিনতার মাঝে আমতা আমতা করে পৃতি বললো,না কিছু না এমনি।
-না কিছু তো একটা ঘটনা ঘটেছে । আমি যে প্রানবন্ত মহোময়ী পৃতি কে দেখেছি এই পৃতি আর সেই পৃতি অনেক পার্থক্য। বল তোমার কি হয়েছে?
– না আমার কিছুই হয়নি। বল তোমার আব্বু-আম্মু কেমন আছে?
-খুবই ভাল আছে। আব্বু মাঝে মাঝে তোমার কথা জিজ্ঞাসা করে। কিন্তু আম্মু প্রতি নিয়ত তোমার কথা জিজ্ঞাসা করে। বলতে পারো দিনে আমার কথা সে এত বার জিজ্ঞাসা করেনা। বল তুমি আমার আম্মুকে কি জাদু করেছো? বুচ্ছি ওই ঘরের ঘরনী হবে তো এই জন্য আগে ভাগে যাদু করে ফেলেছো।
এই কথার উত্তর কি হতে পারে,কি বলবে কিছুই ভেবে পাচ্ছেনা। তবু ও হ্যাঁ না এর সুরে বললো,হয়তবা। রকি পৃতির কাঁধে হাত রাখল। পৃতি সাথে সাথে হাত সরিয়ে দিয়ে বললো,হাত সরাও দেখনা কত কত লোক। লজ্জা করেনা তোমার?
মিষ্টি হাসি দিয়ে রকি বললো,আমার কলিজার গায়ে আমি হাত দিব এতে লজ্জার কি? আমার ভালবাসার মানুষের আমি ছুঁয়ে দেব তাতে কার কি? আমার হবু স্ত্রীর গায়ে আমি হাত দিব তাতে কার কি?
-আমার স্ত্রী মানে,স্ত্রী হয়েছি নাকি? কড়া ভাবে বলতে গিয়ে সাথে সাথে মুখ মিষ্টি করে বললো পৃতি।
– না তবে হবে তো একদিন । বল হবেনা, বল কলিজা তুমি আমার বউ হবেনা?
মুখের মাঝে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো পৃতি । এখন তার চেহারা দেখলে মনে হবে বাকরুদ্ধ কুমারী হা করে তার প্রেমিকের দিকে তাকায়ে আছে। আহারে কি চমৎকার মধু মাখা চাহনী দেখলে নয়ন জুড়ায়।
থুতনি নেড়ে আলত আদর করে রকি বললো, কি দেখছো অবাক নয়নে?
-তোমাকে।
-আমাকে আবার দেখার কি হল,দেখনা চেহারা নষ্ট হয়ে গেছে।
-সে তো আমার জন্য হয়েছে?
-ভাল হয়েছে,যার কারণে আমি তোমাকে পেয়েছি।
-বাসায় যাব।
-বাসায় যাবে মানে এখন? না এখন না আরো পরে যাও। আর তুমি না জুরুরী কি বলবে?
-সেটা পরে বললো,তুমি আমাকে বাসায় দিয়ে আস। বাসায় না বাসার আস পাশে রেখে এলে চলবে। আর তুমি না কি গুরুত্ব পূর্ণ কথা বলতে চেয়ে ছিলে? আরো একটু পরে যাওনা জান পাখি,দেখনা চারিদিকের পরিবেশটা কত সুন্দর । একটু মোটা গলায় পৃতি বললো,বললাম না আমি বাসা যাব। কেন জোর করো।
রকি পৃতির ব্যবহারে অবাক হয়ে গেল। ঠিক যেন কলকল বৃষ্টির মাঝে হঠাৎ বজ্রপাত। রকি আর কোন কথা না বাড়ায়ে বাইক স্ট্রাট দিল। পিছে বসল পৃতি এক সময় বাইক টি বনশ্রী এলাকাতে এসে থামলো। বি ব্লকে আসার পর পৃতি বললো,আমার এখানে নামিয়ে দাও। বাইক থামানোর পর পৃতি বাইক থেকে নেমে রকির একেবারে গা ঘেসে দাঁড়িয়ে বললো,সরি। আমার না বাড়ীর অনেক সমস্যা যা আমি তোমাকে বলতে যেয়ে বলতে পারছিনা। তুমি আমার উপর কোন দিন অভিমান বা রাগ করবে না,তাহলে তোমার চেয়ে আমি বেশি কষ্ট পাবো। বলেই চলে যায় পৃতি। মন টা আবার ফুর ফুরে হয়ে গেল রকির। মনে হচ্ছে কলকলে বৃষ্টির মাঝে হাঁঠাৎ উত্তরীয় দমকা হাওয়া। আহা!
বেদনার নীলে লাল রং শোভা পায় না। তেমনি কোন কিছুই ভাল লাগেনা পৃতির । বাড়ীতে আনন্দের ফুল্লধারা চলছে। আত্মীয় স্বজন লোকজনে ভরপুর। চারিদিকে হই হই রই রই। এই হই হই রই রই এর মাঝে পৃতির মনে হায়! হায়! অবস্থা। যে অবস্থা বুঝতে পারলো তার স্বামি ডোনা। ডোনা দুঃচিন্তা যুক্ত মনে করল পৃতিকে। সে খুব নিকটে এসে অতি সংগোপনে বললো, তোমার কি কিছু হয়েছে পৃতি? মন খারাপ কেন? কোন কিছু হলে আমাকে বলতে পারো। পৃতি ডোনার কথা স্বর শুনে অনুভব করলো আগের ডোনা আর এখন এর ডোনার ভিতর অনেক পার্থক্য। এই কয়দিন তার আচার আচারণে বুঝতে বাকি রইলোনা তার স্বামী তাকে কত ভালবাসে।
পৃতি বললো, না কিছু হইনি বন্ধুদের কথা খুব মনে পড়ছে। তাদের আসার কথা; কেন জানি কেউ এখনো আসছে না। ও তাই তোমার এত চিন্তা, না জানি ওদের ছেড়ে থাকবে কি ভাবে! মিষ্টি মিষ্টি করে কথা গুলো বললো ডোনা।
– সে চিন্তাতো অহরহ আমাকে দংশন করছে।
কথা বলতে না বলতেই দল বেধে উদয় হইল মলি বাহিনী। বান্ধবীর পাশে বসা অচেনা মানুষটিকে দেখে বান্ধবীদের বুঝতে বাকি থাকল না মানুষটি কে। পৃতির সাথে কুশল বিনিময় করার পর মলি বলিল, আমরা যার জন্য এসেছি,সেই মানুষটি বুঝি ওই। ডোনা একটা স্মার্ট ছেলে সব সময় ফ্রাঙ্কলি কথা বলতে ভালবাসে। সেই ডোনার যেন লজ্জা পেল । মাথাটা নিচু হয়ে গেল।
শেফালী – তা আমাদের বান্ধুর বর কি বোবা? মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছে না।
সবাই মিলে হেসে দিল। ডোনা বললো, শুনবেন, কেন বের হচ্ছে না? আপনাদের দেখে আমার খুব হিংসা হচ্ছে।
পলি – কেন আমরা কি করলাম?
– মহাক্ষতি করেছেন। কারণ আমার পৃতি আমার কথা না ভেবে দিনে রাতে ভাবে শুধু আপনাদের কথা।
মলি পৃতির দিকে তাকিয়ে দেখল বুঝল,দিন রাত সে কাকে নিয়ে ভাবে। কারে নিয়ে চিন্তামগ্ন থাকে সারাক্ষন। প্রসঙ্গ সামলে নিয়ে মলি বললো, দেখতে হবে না বান্ধুটা কাদের।
– আপনাদের বন্ধু যখন দুদিন পরে আমার ঘর-বন্ধু হবে, তখন কি হবে?
ওরে বাপরে পৃতির বর মনে করলাম বোবা স্বভাবের হবে ওরে বাবা এ দেখি পাকা আছে- বললো মলি।
– শুধু পাকা নয়রে মলি এ একেবারে রাম পাকা বললো বান্ধবী বন্যা। তারপর সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
-আমাকে কিন্তু নিত্যান্ত অপমান করা হচ্ছে। আমি কিন্তু কেঁদে ফেলবো। তখন কিন্তু কেউ থামাতে পারবেনা হা হা হা।
-কান্না থামানোর জন্য মানুষ তো দিলাম। আপনি শুধু কাঁদবেন আর সে শুধু থামাবে হা হা হা বললো লু পিয়ানা। এখন ডোনা উপলব্দি করলো-
ভালবাসা এক ধরনের মায়া। যেখানে পুরুষ এক নারীকে অন্য নারী থেকে আলাদা করে দেখে। আর নারী এক পুরুষকে অন্য পুরুষ থেকে আলাদা করে দেখে। লুইস ম্যাকেন
পৃতি সবার হাসা তামাসা শুনে মেজাজ খারাপ হতে থাকলো বললো মলি তোরা কথা বল আমি ভিতর থেকে আসছি। পৃতি ভিতরে চলে যেতে যেতে থেমে গিয়ে আবার ফেরত আসল বললো,মলি আমি উপরে আছি উনার সাথে কথা শেষ হলে আসিস তো। মলি সব বুঝতে পারলো পরিবেশটা মেন্টেন করে বললো,ঠিক আছে তুই যা আমরা আমাদের দুলাভাইকে আর একটু বাজায়ে উপরে আসছি, তোর সাথে আমার ও কিছু মজার এবং টেস্টিং কথা আছে। মলি ও শেফালী মিলে আবার নানান রঙের আলতু ফালতু কথা দিয়ে আড্ডা জমিয়ে দিল। আড্ডাটা চিংড়ি মাছের বাজারের মত বেশ জমেছে। হুররে!
বেশ কিছু সময় অতিবাহিত করে মলি তার বাহিনী নিয়ে উপরে চলে গেল। দেখল পৃতি মন খুব খারাপ করে বসে আছে। মলি বললো, মন খারাপ করে কি করবি তোর কপালে যা ছিল তাই তো ঘটেছে। তোকে উপদেশ দেওয়ার মত ভাষা আমার নেই। কারণ রকি ভাইয়ের কথা যদি চিন্তা করি তাহলে তোর সব কিছু র্হাতে হবে। আবার যদি তোর দিক টা চিন্তা করি তাহলে রকি ভাই এর জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে। এমত অবস্থায়..কথা আস্তে বল শুনতে পারে, বলে মুখের কথা থামিয়ে দিল পৃতি। এবার নিজে বলতে শুরু করলো। আমি এ কয় দিন ধরে চিন্তা করে যা ঠিক করে রেখেছি তাই করব। শুধু বিয়ের একদিন আগে অথ্যাৎ আগামী বুধবার আমি রকির সাথে দেখা করবো। তোরা রকিকে নিয়ে হাতির ঝিলে অপেক্ষা করবি আমি আসব। তখন সব সমস্যার সমাধান সেখানে করব। মলিবাহিনী মর্ধাণ্য ভোজন সমাপ্ত করে চলে আসল।
*****
মিনিট যায় ঘন্টা আসে, ঘন্টা যায় দিন আসে, বিয়ে বিষয়ক অনুষ্ঠানের দিনটা দৌড় গোড়ায়। এর ভিতর সকল আয়োজন সমাপ্ত। দূরের নিকটের আত্মীয় কম বেশী সবার আশা প্রায় সমাúÍ। আজ বাদে কাল পৃতির বিবাহ। পৃতি কি করবে না করবে সব জল্পনা কল্পনা কল্পনা শেষ। রকিকে বান্ধবীদের দেয়া কথা অনুযায়ী হাতির ঝিলের পূর্ব পাশের রোড ব্যালকোনিতে এসে উপস্থিত হল। দেখল রকির বন্ধুরা ও পৃতির বান্ধবীরা সহ প্রায় ১৫ জন সেখানে উপস্থিত। দূর হইতে মনে হচ্ছে এখানে ছোট খাট হট্টগোল অথবা আনন্দ আড্ডা হচ্ছে। পৃতি এইখানে তার ব্যাথ্যা ভরা হৃদয় ও সাহস নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। শুধু নির্বাক নয়নে রকির পানে তাকিয়ে রয়েছে । আজ কয়দিন যেন রকির কিছুই ভাল লাগছিলনা মনের ভিতর সর্বদা যেন কিসের জ্বালা পোড়া ছিল । তার একটা ভাবনা সর্বদা উদয় হচ্ছে। সে যেন কিছু না কিছু একটা হারাইতেছে। পৃতিকে দেখে কেন জানি তার সেই আশাঙ্খটা টা আরো তীব্র ভাবে দেখা দিয়েছে। সহসা উঠে দাঁড়িয়ে পৃতির নিকটে এসে বললো, তোমাকে এত বিষণœ দেখাচ্ছে কেন, পৃতি মাঝে মাঝে তোমার কি হয় ? পৃতি ভেজা ভেজা কন্ঠে বললো, আজ হয়ত বিষণœ অবস্থায় আমাকে দেখতে পাচ্ছো কিন্তু কাল হয়ত তাও দেখবে না।
– একি বলছ পৃতি; আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
– আমি তোমাকে কি বলতে এসেছি কেন বলতে এসেছি এ কথা গুলো অনেক আগেই তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় বলতে পারিনি। সুযোগ পেয়েছি বটে; হয়ত সে সময় বললে আজ এখানে আমি তোমাকে দেখতে পেতাম না। তোমাকে দেখতে হলে আমাকে ও মরণ চাদর গায়ে দিতে হত।
– কি হয়েছে সব খুলে বলনা পৃতি।
-কেন, মলিরা তোমার সাথে কিছুই বলেনি বুঝি?
– কই, না তো!
– ও খুব ভাল করেছে। আজ আমি তোমাকে সব বলব। কিন্তু তার আগে আমাকে কথা দিতে হবে তুমি ভেঙ্গে পড়লে চলবে না। তা হলে হয়ত আমাকে বলা হবে না। এক বুক ব্যথা নিয়ে চলে যেতে হবে। রকি কি ভাল কথা কি মন্দ কথা ঠাহর পাইলো না শুধু বললো, তুমিই আমার সব, আমি তোমার জন্য সব করতে পারি। আমার পৃথিবীতে তুমিই আমার এক মাত্র সব।
– তাহলে তোমাকে আমার দিব্যি রইল কথাগুলো নীরব হয়ে আগে শুনবে পরে আমার কাছ থেকে জবাব নিবে। রকির বুঝতে বাকি রইলো না পৃতি কি বলতে চায়। দুঃখ ভরাক্রান্ত মন নিয়ে বললো, বল তুমি কি বলবে।
পৃতি সবার উদ্দেশ্য করে বলতে থাকল। এখানে কিছু রকির বন্ধুরা ও কিছু আমার বন্ধুরা উপস্থিত আছে। আজ আামি খুবই দোষী। মা-বাবার ২য় সন্তান আমি; আমার বড় বোন যখন তার ভালবাসার মানুষটির হাত চলে যায় তখন আমি খুব ছোট। বড় আপু তার ভালবাসার মান রাখতে যখন চলে গিয়ে গিয়েছিল তখন আমার পিতা মাতা একে বারে পাগলের মত হয়ে গিয়েছিল। আব্বু খুব ভাল বাসতো আপুকে । বলতে গেলে আমার চেয়েও । অবশ্য এখানে আমার আপুর দোষটা খুব কম ছিল। রবিউল ভাই অথ্যাৎ আমার দোলা ভাই তিনি বারে বারে আব্বুর কাছে লোক পাঠিয়ে ছিল আপুর জন্য বিয়ের প্রপোজল নিয়ে কিন্তু আমার আব্বু অপমান করে বের করে দিয়েছিল। কারণ অনেক টা বলতে গেলে রবিউল ভাই আমাদের চেয়ে মান সম্মানে অর্থে বিত্তে অনেক কম ছিল। যাইহোক, আমার স্মৃতি আপুর চলে যাওয়া টা আব্বু কোন ভেবে মেনে নিতে পারিনি। আর এই ঘটনার সমস্ত চাপ এসে পড়ে আমার উপরে। তার প্রায়চিত্ত আমি এখনও করে চলেছি। কথা গুলো বলতে বলতে কন্ঠ নরম হয়ে যায় পৃতির। সে যখন কথা গুলো বলছিল তখন তার নজর হাতির ঝিলের দিকে। কারণ সে জানে যে কথা গুলো সে যে অনায়াসে বলে চলেছে। তা রকির মুখের দিকে তাকালে এ ভাবে বলতে পারবে না। রকির মুখে কোন ভাষা নেই। নেই কোন উচ্ছলতা যে উচ্ছলতা নিয়ে সে এখানে এসেছিল। সে শুধু পৃতির কথা গুলো শ্রবণ করে চলেছে। হৃদয়টা ভেঙে চুরমার হয়ে চলেছে। নদীর তীরে আচড়ে পড়া ঢেউ এর মত। চোখের মাঝে বাচ্চা ছেলের মত পানি চলে আসছে । কিন্তু সবাই বোঝার আগে চুপি সারে মুছে ফেলছে রকি। পৃতি তার না বলা কথা গুলো থেমে নেই। বলেই চলেছে।
আমি দশম শ্রেনীতে পড়া কালীন বিদেশ পড়ারত বাঙালী এক ছেলের সাথে আমার বিয়ে দেয়। আমার বিয়ের বয়স না হওয়ায় বা আইনের উপর শ্রদ্ধা জনাতে ছেলে পক্ষরা আমাকে ঘরে তুলে নেইনি। এখন সে সময় ঘনিয়ে এসেছে। কাল তারা আমাকে ঘরে তুলবে আমি বিদেশে চলে যাব। আমি জানি রকি এ কথা গুলো শোনার পর খুব কষ্ট পাবে। আমাকে কোন দিন ক্ষমা করতে পাববে না। রকি আর কান্না চেপে রাখতে পারেনা ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। কেঁদে ওঠে পৃতিও । এই পরিস্তিতে যারা দর্শনার্থী তারা কি আর চুপ থাকতে পারে। রকির কান্না দেখে সবার চোখে কান্না চলে আসে। তবে তাদের কান্না নিঃশব্দের। পৃতির কান্না দেখে তার বান্ধবীরা কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনা।।পৃতি কান্না জড়িত কন্ঠে কথা বলেই চলেছে। আমি তার সাথে জড়াতে চাইনি শুধু ওর জীবন বাঁচাতে আমি ওর সাথে জড়িয়ে গেছি। বারে বারে কথা গুলো ওকে বলতে চেয়েছি কিন্তু বলার আগে ও আমাকে আবেগ ঘন মুহত্বে জড়িয়ে ফেলেছে ফলে আমি ওকে কিছু বলতে পারিনি । রকি উচ্চস্বরে কেঁদে উঠে পৃতিকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। পাশের লোক জন এই দৃশ্য দেখে দাঁড়িয়ে গেছে। রকির বন্ধুরা পথচারীদের চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলো। পথচারী চলে যায়। তবে যাওয়ার সাথে এই প্রেম বিচ্ছেদের কাহিনী স্বচোখে আবার দেখার চেষ্টা করে। রকি কাঁদার সুরে সুরে বলছে-পৃতি তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যেতে পারোনা। তোমাকে আমি কোন ভাবে যেতে দেবনা। আমি মারা যাবো তবুও তোমাকে যেতে দেবনা। তুমি তো আমার আত্মা আর আত্মা ছাড়া কোন জীব বাঁচে তুমি বল? তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবেনা। উচ্চস্বরে কান্নার কারণে তার কথা গুলো অস্পর্শ শোনা যাচ্ছে। রকির কান্নায় যে সব চেয়ে ভেঙে পড়েছে সে হল মলি। তার নিরবে বুক ভেসে যাচ্ছে । কাউকে কিছু বলতে ও পারছেনা। পৃতি রকির বুকের ভিতর ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। এক অন্য রকম পরিতৃপ্তির সাথে রকির বুকের সাথে মিশে আছে। অনুভব করলো সে যে বুকে লুকিয়ে আছে এটাই বুঝি তার স্থান। আর অন্য কিছুই তার মাথার ভিতর নেই নিমিশেই সিদ্ধান্ত নিল সে রকি কে ছেড়ে যাবেনা।

পৃথিবীতে বালিকার প্রথম প্রেমের মত সর্বগ্রাসী প্রেম আর কিছুই নাই। প্রথম যৌবনে বালিকা যাকে ভালোবাসে তাহার মত সুভাগ্যবান আর কেহই নাই। যদি ও সে প্রেম অধিকাংশ সময় অপ্রকাশিত থেকে যায়,কিন্তু সে প্রেমের আগুন সব বালিকাকে সারা জীবন পোড়ায়। রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর।
জানিনা রবি ঠাকুরের কথা দুজনের জীবন জুড়ে বয়ে চলে কি’না।
বুক থেকে মাথা উপরের দিকে উঠায়ে রকির চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষন পৃতি। যে সময় টুকুতে পৃতি রকির চোখের দিকে তাকিয়ে আছে সেই সময়ে রকির চোখের পানি তর তর করে পৃতির মুখের মাঝে পড়তে থাকলো। চোখের গরম পানিতে পৃতির মন আরো নরম হয়ে গেল। এবং রকির বুকে তার মুখ আবার ও লুকিয়ে ফেললো । বললো আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবোনা। চারিদিক হতে আনন্দের ফুল্ল্যধারা উত্তেলিত হতে লাগলো। করতালিতে মুখরিত হল। এই করতালি টা যেন পৃতির কানে মধুর সুরের মত মনে হল। সে আরো জোরে রকির বুকে সাথে নিজেকে জড়িয়ে ধরলো। এ মধুর আলিঙ্গনে দুজন দুজনকে জড়িয়ে থাকলো কিছুক্ষন। হঠাৎ রকির শার্টের ফাঁক দিয়ে পৃতির নজর টা সামনে পড়লো । দেখলো এক মহিলা হেঁটে আসছে যে মহিলা দেখতে হুবাহু তার বড় বোনের মত মানে পার্কের সেই মহিলার মত। রকির বুকের মাঝে থেকে আরো কিছু টা সময় মহিলাকে দেখার চেষ্টা করলো পৃতি। কেন জানি মনে হল গত দিন সে যে মহিলাকে দেখেছিল। সেই মহিলা আর এই মহিলা হুবাহু একই। রকির বুক থেকে মাথা সরায়ে পৃতি মহিলাটিকে দেখার চেষ্টা করলো। মহিলাটি একবার ফিরে তাকালো পৃতির দিকে। থেমে গেল মহিলাটি। হঠাৎ পাশ থেকে এক প্রাইভেট কার এসে থামলো। গাড়ীর ভিতর হতে একটি ছোট ৪ বছরের শিশু ডাকদিল, আম্মু ভিতরে এস। মহিলা টি আনমনা হয়ে গাড়ীর ভিতরে প্রবেশ করলো। গাড়ী চলতে থাকলো । মহিলাটিকে আনমনা হতে দেখে মহিলাটির স্বামি বললো,তোমাকে আনমনা লাগছে কেন? মহিলা কিছুই বললোনা। পিছন হতে বাচ্চাটি বললো আম্মু যে মেয়েটি তোমার দিকে তাকায়ে ছিল সে কিন্তু সেম তোমার মত দেখতে, সি লাইক ইউ। ড্রাইভিং সিট হতে রবিউল বললো,তোমার পৃতি আন্টির কথা বলছো সে এখানে আসবে কোথা থেকে তার তো অনেক আগে বিয়ে হয়ে গেছে। গাড়ী সামনে যেতে শুরু করলো।
পৃতির সমস্ত শরীর ঝড়ের মত কাঁপতে থাকলো। রকি বললো পৃতি এমন করছো কেন? পৃতি বললো আমি বাসায় চলে যাবো। রকি বললো বাসায় চলে যাবে মানে। তুমি কি বল না বল আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারিনা ? কোন আবেগে হঠাৎ পৃতি আবার ডুকরে কেঁদে উঠলো।
-রকি আমি আমার আব্বু-আম্মুর মনে আর কষ্ট দিতে চাইনা। আমার বড় আপু তাদের কনেক কষ্ট দিয়েছে,আমি যদি সেই কষ্ট দেই। তাহলে তাদের আত্ম হত্যা করা ছাড়া কোন পথ থাকবে না। আমার জন্য আর কষ্ট পেয়োনা প্লিস ভুলে যাও পৃতি নামে তোমার জীবনে কেউ এসেছিল। রকি যেন আবার বাক রুদ্ধ হয়ে গেল। কিছুটা স্থিমিত,যাকে বলে স্বাভাবিক হওয়ার বৃথা চেষ্টা । রকির বন্ধু অনি বললো,পৃতি দেখো জীবন টা ছেলে খেলা নয়। একটা জীবনের অনেক মূল্য,তুমি কখন কি বলছো সেটা একবারও কি ভেবে বলছো। মলি বললো,দেখ পৃতি তোর এই খাম খেয়ালীপনা আমার একদম অপছন্দ। কি করবি না করবি একে বারে বলে ফেল। পৃতি সবার মুখের দিকে অবালা শিশুর মত তাকায়। সবার মুখের উপর হতে যখন মুখটা ফিরায়ে নিয়ে যখন রকির মুখের দিকে তাকায় তখন কেন জানি সব কিছু তার এলোমোলো হয়ে যায়। ইচ্ছা করে ওই বুকে ঝাপিয়ে পড়ে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে। কিছু টা স্বাভাবিক এখন পৃতি, ভেবে চিন্তে ধীর স্থির ভাবে বলতে শুরু করলো। আমি মুসলমানের মেয়ে আমার এক জবান আমি ওর মাকে কথা দিয়েছি এবং ওকে কথা দিচ্ছি আমি এ জীবনে এক দিন না’এক দিন আমি ওর বউ হয়ে আসব। আর এর ভিতর ওর যদি ১০ টা বিয়েও করে তা কোন অসুবিধা নেই। শুধু আমার প্রতিজ্ঞা আমি পালন করব। আর আমি অবশ্যই চলে আসব ও যদি আমাকে গ্রহন না করে আমার কোন আপসোস থাকবে না। আমি একা একি জীবন যাপন করব । তবে স্বামির ঘরে ফিরে যাব না। শুধু আমার পিতা মাতার জন্য আমার স্বামির ঘরে ফিরে যেতে হবে। আমার কথা বলা শেষ; এবার রকি কিংবা আপনারা বা মলি তোরা কিছু যদি বলতে চাস বলতে পারিস।
রকি হতভম্ব হয়ে গেল চোখ দুটি স্থির হঠাৎ বেহুঁস হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
ভালোবাসা যদি তরল পানির মত কোন বস্তু হত,তাহলে সে ভালবাসায় সমস্ত পৃথিবী তলিয়ে যেত। এমন কি হিমালয় পর্বত ও। হুমায়ূন আহমেদ
হিমালয় পবর্তের চেয়ে ও যদি বড় কিছু থাকে তাও রকির ভালসার কাছে তলিয়ে যাবে। বন্ধুরদের ভিতর হই চই পড়ে গেল । সবাই রকির কাছে চলে আসলো। মলি পানির বতল হতে পানি নিয়ে রকির মুখে ছিটে দিতে লাগলো আর পৃতিকে ভৎসনা করতে লাগল। সেময় পৃতি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখের জল ফেলছিল। ততক্ষনে রকির ভ্রম ফিরল। পৃতির চোখের দিকে তাকিয়ে একটা কথা বললো,আমার কোন আপসোস নেই পৃতি তুমি যেতে পারো। পৃতি বললো, তুমি কথা গুলো রাগে অভিমানে বলছো আমি মনে হয় বুঝতে পারিনি মনে করছো’না। উপরে আল্লাহ আছে,এবং এখানে সবাইকে সাক্ষি করে বলছি আমার বিয়ে এক দিন না’এক দিন তোমার সাথে হবে। তুমি না চাইলে ও আমি তোমার কাছে ফেরত আসবো।
রকি কোন কথা বলছেনা কেউ কোন কথা বলছেনা।
সাক্ষি সবাই। এই তোমার মাথা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করছি, আমি এক দিন তোমার বঊ হব।
অবশেষে পৃতি বিদায় নিল।
‘‘ সবাই তোমাকে কষ্ট দিবে,তোমাকে শুধু এমন এক জন কে খুঁজে নিতে হবে যার দেওয়া কষ্ট তুমি সহ্য করতে পারবে’’ হুমায়ুন আহমেদ
এই বিখ্যাত লোকের উক্তি যেন রকি মাথায় ধারন করল।
*****
বিয়ের দিন মন কষ্টে নিয়ে ও মলি সেখানে গিয়েছিল,মলি যাইতো না গিয়েছিল শুধু মাত্র রকির জোরা জুরিতে । কারণ সে মলিকে দিয়া একটি পেইনটিং উপহার দিয়েছিল তাতে লেখা ছিল
‘‘থাকব তোমার পথ চেয়ে
শেষ বিকেলের মেঘ হয়ে”
এই উপহার টুকু পৃতি বুকের ভিতরে নিয়ে গ্রহন করল অথ্যাৎ রকির উপহার টুকু পাওয়া মাত্রই বুকের সাথে চেপে ধরলো। রকি না আসায় পৃতি মলিকে জড়িয়ে খুব কান্না করতে থাকলো। এবং সবার অজান্তে একটা ডাইরি উপহার দিল রকির উদ্দেশে। ডাইরির প্রথম পাতায় লিখে দিল ।
‘‘আমি এক দিন আসব ফিরে
যদি মরে যাই তবে শঙ্ক চিল হয়ে।
বেঁচে থাকলে আসব ফিরে
শেষ বিকেলের মেঘ হয়ে ’’
দ্বিতীয় পাতায় লেখা ছিল। আমি তোমার কাছ থেকে চলে আসার পর থেকে আবার আমি তোমার জীবনে ফেরত আসা না পর্যন্ত যে কাহিনী ঘটবে তা অবশ্যই লিখে রাখবে। আমি ফেরত আসার পরে সে গুলো পড়ে সেই ঘটনা গুলো যেন নিজের সাথে মিলায়ে নিয়ে সুখে দুঃখে একাকার হয়ে যেতে পারি।
*****
মলি ডাইরিটা যে সময় রকির কাছে পৌঁছালো। সে সময় পৃতি বিমানে উড়তে ছিল। রকি পৃতির দেওয়া ডাইরি টা বুকে ধারন করে নিভৃতে নিরালয়ে বারি ঝরাতে লাগলো,ও আপন মহিমায় লেখা গুলো পড়তে থাকলো সাথে সাথে ডাইরিটাকে পরম যন্তে হাত বুলাতে থাকল।
সাংসারিক জীবন শুরু হয়েছে পৃতির । চলে দিন, কাটে আধার, আসে বছর, পুণ্য হয় যুগ।
////কেটে যায় ত্রিশ টা বছর///

**************************************************

মা হয় পৃতি বেগম। পৃতি বেগমের দু ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে জব করে । মেজ ছেলে অর্নাস থার্ড ইয়ার, মেয়েটা নবম শ্রেণীতে পড়ে। ছেলে মেয়ে স্বামী নিয়ে তার সুখের সংসার। কিন্তু রকিবুল হাসান রকির শুধু একটি মাত্র সংগী সেই পুরানো ডাইরি ও কিছু খাতা ও কলম। কয়েক বছর হলো রকির পিতা মারা গেছেন। অসুস্থ শরীরে বিছানায় পড়ে আছে মা। তিনি পুত্র বিবাহের ব্যার্থ প্রয়াস করে যাচ্ছে এই ৯০ বছর বয়সে ও। কিন্তু ফল হয় না।
পাগলী আমার ঘুমিয়ে পড়েছে মুঠোফোন তাই শান্ত,আমি রাত জেগে দিচ্ছি পাহারা মুঠো ফোনের এই প্রান্ত,এ কথা সে যদি জানতো’ । নির্মলেন্দু গুণ
‘নির্মলেন্দু গুনের কবিতার মত দিন গুলি অতি বাহিত করে আসছে রকিবুল হাসান রকি। রকি বর্তমান সময়ে সাড়া জাগানো কবি। আলোচনায় কয়েক জনের মধ্যে সে একজন। প্রেম বিষয়ক কথিকায় সে প্রথম। সে দেশের দামি দামি পত্রিকা গুলোর নিয়মিত লেখক। বাজারে বর্তমানে ১৫০ টার মত সফল উপন্যাস চলছে।
পৃতির সন্তানদের ভালবাসায় ও স্বামির মহিমায় প্রায় ভুলে ছিল এই ৩০টি বছর সে ভুলেই গিয়েছিল রকির কাছে ফিরে আসার কথা। একদিন নামাজ শেষে চোখ পড়লো দেওয়ালে ঝুলানো সেই পেইন্টিয়ের দিকে- লেখা গুলো এখন প্রায় অস্পষ্ট
‘‘থাকব তোমার পথ চেয়ে
শেষ বিকেলের মেঘ হয়ে”
লেখা গুলো প্রায় তার চোখে পড়ে কিন্তু আজ যেন তার চোখে অন্যভাবে পড়লো প্রার্থনার সময় মনে করলো রকির কাছে ফেরত যাওয়ার সময় হইছে। বিবেক বারে বারে নাড়া দিচ্ছে। অতিতে রকিকে কথা দেওয়ার জন্য স্বামি, সন্তান-সন্তুতি, আত্মীয় স্বজন সব ত্যাগ করতে হবে। আবার না করলে সে যে বিশ্বাস ঘাতকীনি হয়ে যাবে। আল্লাহ কথা বেখালাপকারী কে কোন দিন ক্ষমা করিবেন না।
তাই পৃতি সেই প্রথম জীবনের মত সব চিন্তা শেষ করে সন্তান সহ স্বামীকে বললো, দুই একের মধ্যে টিকিটের ব্যবস্থা করতে তার আশু বাংলাদেশে যাবার প্রয়োজন। মূল ঘটনাটা কেহ বুঝতে পারে না। স্বামী সহ সন্তানরা অনুভব করল। তার দেশের বাড়ীতে আত্মীয় স্বজনদের সাথে মেলা মেশার প্রয়োজন অনেক দিন দেখা হয়না তাদের হয়ত, তাদের দেখতে খুব ইচ্ছা করছে মনে হয়। সম্মতি জানায়ে বড় সন্তান টিকিটের পাওয়ার সকল ব্যবস্থা করলো। স্বামী দৌলত হোসেন ডোনা বললো, তোমার বড় ছেলে তোমার বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য টিকিট ফাইনাল করেছে। সন্তানরা যখন সামনে দিয়া সুখের উল্লাসে হেঁটে বেড়ায় ব্যাথায় তার বুক কেঁপে ওঠে। মনের অজান্তে পৃতি বলে ওঠে, সত্যই কি টিকিট কেটেছিস বড় ছেলে? বড় ছেলে রায়েল বলে আম্মু তুমি নানি বাড়ীতে যেতে চেয়েছো আর আমি টিকিট কাটবোনা এটা কি কখনও হয়। মেয়ে লিজা দৌড়ে এসে মায়ের মুখে চুমু খেয়ে বলে, তুমি আমার লক্ষি মাম। তুমি জলদি ফিরে আসবে। আমার এক্সজাম না থাকলে তুমি না চাইলে তোমার সাথে আমি জোর করে হলে ও যেতাম। স্বামী পরম সুখে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে, পৃতি তোমার শরীর খারাপ এমন করছ কেন, কারো কথা কি খুব মনে পড়ছে? কারও কথায় কোন জবাব দেয় না পৃতি বেগম। হাজার প্রশ্ন মনের মাঝে জমা হয়ে থাকে সমাধান পায়না। মনে প্রশ্ন জাগছে,সে কি রকির দেখা পাবে? সে বা কোন হালে আছে! সে যদি আবার গ্রহণ না করে? তাহলে সন্তানদের সামনে মুখ দেখাবে কেমন ভাবে। বা তার ছেলে মেয়ে স্ত্রী তার সেখানে যাওয়াটা যদি অন্য ভাবে দেখে।
পৃতির আত্মবিশ্বাস কোন দিন রকি হতে সে অসম্মানি হবে না। কিন্তু সে কি ভাবে স্বামী সন্তান রেখে চলে যাবে,চিন্তায় তার দু চোখের পাতা এক হয় না।
মাঝে মাঝে আত্মার সম্পর্ক রক্তের সম্পর্কেও অতিক্রম করে যায়। হুমায়ূন আহমেদ

তাই বুঝি পৃতি বেগম সব চিন্তার অবসান ঘটিয়ে গভীর রাত্রে স্বামি ও সন্তানদের উদ্দেশে একটা চিছি লেখা শুরু করে…
আমার বুকের মানিকেরা,
চিঠির শুরুতেই আমার বুকের সমস্ত ভালবাসা দিয়ে তোদের ভালবাসা জানালাম। আমি যে তোদের কত বড় পাষান মা, আমাকে যেন আল্লাহ ক্ষমা না করেন। তবে আমি নিষ্ঠুর বা পাষান নইরে! আল্লাহ কে ভালবেসে আমাকে হতে হয়েছে।
তোরা যখন আমার চিঠি পড়ছিস হয়ত আমি বিমানে । তোরা আমায় দোয়া করিস, আমি যেন বাংলার মাটি স্পর্শ করার আগে মরতে পারি। কারণ আমি এমনই এক নারী আমার স্বামি আছে,কলিজার টুকরার মত তিনটি বাচ্চা রয়েছে,সুখের সংসার রয়েছে; তা ছেড়ে আমি কোন এক পর পুরুষের উদ্দেশ্য পা বাড়িয়েছি; তবে তোদের মা সতী নারী। আমার প্রানের পাখিরা তোরা তোর পিতাকে খুব জন্ত করিস। উনি আমাকে খুব ভালবাসেন।
তোদের বাবাকে বলছি… তুমি তো জানো, আমার দেহে সেই কামনা বাসনা নেই, যে আমি তার জন্য ঘর ছেড়েছি। আমি যৌবনে এক ছেলের জীবন বাঁচাতে আল্লাহকে সাক্ষী করে এক প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হয়েছিলাম যে, এই জীবনে তার কাছে এক বার ফিরে যাব। বিয়ের পর থেকে তার সাথে আমার কোন সংযোগ ছিল না। জানি না; সে তার কথা মত আমাকে গ্রহন করবে কিনা। তোমার ঘরে যাওয়ার পর থেকে আল্লার পথে মন নিবিষ্ঠ করে তাকে ভুলে থেকেছি। কিন্তু প্রেম পবিত্র আল্লাহর ইশারায় হয়ত তার কাছে যাওয়ার জন্য আমার মন ব্যাকুল হয়েছে। আবার বলছি তার কাছে যাচ্ছি দেহের টানে নয় মনের টানে।
আমার সন্তানেরা বড় মা পাগল, আমি কত বড় পিসাচ তাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছি। কিন্তু কি করব, ভার্সিটি জীবনে আমি মৃত্যু শ্যর্যায় থাকা রকির মাকে কথা দিয়েছিলাম, আমি একদিন তার ছেলের বউ হব।
আমার এক মাত্র মেয়েটা সে যে মায়ের হাতে খেতে ভালবাসে তাকেও ছাড়লাম। তোরা দুই ভাই যেন ওকে গাল মন্দ করিস না। আমি আমার ভালবাসার দাম দিতে যেয়ে এটা করেছি। এরপর ও যদি আমাকে ক্ষমা করিস তাহলে ঠিকানা দেব আশিস। অনেক স্বপ্ন থাকে মা বাবাকে নিয়ে। কিন্তু আমি তোদের পাষানী মা তোদের ভালবাসা চোখে সইতে পারলাম না। আমি তোদের ভালবাসা আজীবন স্মরণ রাখব। তোদের জীবনে শান্তির সিঁড়ি আকাশ ছোঁয়া হোক। বাবা কে দেখে রাখিস। তোরা ফুলের মত ফুটে থাকবি । যে ফুলের গন্ধে পৃথিবী বিমহিত হবে।
কেউ আমাকে ক্ষমা করিস না।
ইতি
তোদের মা

*****
আজ প্রায় ৩০ বছর পর এই বাংলার মাটিতে আবার পা রাখল পৃতি। সে যেন অনুভব করল এই সেই হাওয়া; যে হাওয়া তার কিশোরী বয়সে মনকে দোলা দিয়ে দিয়ে যেত। ঝিঝি পোকার শব্দ মনের বিনায় গান তুলতো। যে পাখি আকাশে উড়াল দিলে শান্তি আহবানে কন্ঠ বেজে উঠত গান। গাছে গাছে ফুল গুলি প্রেমের পরশ পাবার জন্য উম্মুখ হয়ে চেয়ে থাকত। সব কিছুই মর্মে মর্মে অনুভব করতে লাগল পৃতি। কিন্তু আজ তার অনুভব করার শক্তি আছে কিন্তু অনুভূতি নেই। বয়স তার প্রায় শেষ বিকালের রবির মত। সিএনজি তে বসে চেনা চেনা জায়গা গুলি দেখে স্মরণ করতে লাগল কোন জায়গায় রকির বাসা ছিল। অনেক বছর হয়েছে ঢাকার চেহারা পরিবর্তন হয়েছে। যায়গা গুলো সব অচেনা অচেনা মনে হচ্ছে পৃতি বেগমের কাছে। আসে পাশে শুনতে শুনতে এক সময় রকির বাসায় মগবাজার বাটার গলিতে পৌঁছাল পৃতি। বাসায় এসে পৃতি দারোয়ান কে জিজ্ঞাসা করলো এটা রকিবুল হাসান রকি সাহেবের বাসা ? দারোয়ান পরিচয় সব কিছু জেনে উপরে টেলিফোন করলো তারপর তাকে ভিতরে যাওয়ার অনুমতি দিল। রকির একটা ধারনা ছিল । এই মগবাজার বাটা গলি হতে রকি কোথায়ও যাবেনা। কারণ এটা তাদের নিজ্বস ফ্লাট। পৃতি বেগম বাসার ভিতর যখন প্রবেশ করলো তখন বাজে বিকাল ৩.০৫ মিনিট। বাসায় প্রবেশ করে পৃতি দেখতে পেল চুল পাকা একটা খুড় খুড়ে এক বুড়িকে। এনাকে দেখে পৃতির বুঝতে বাকি রইলো না যে, ইনিই রকির মা। এখনও বেঁচে আছেন! পৃতি কদম্মুচি করে বললো, মা দেখেনতো আমাকে চিনতে পারেন কিনা। দাঁড়ি কাঁপাইতে কাঁপাইতে বুড়ি কলল, কই নাতো দারোয়ান তোমার নাম কি জানি বললো ভুলে গেছি, তুমি কে বলছ?’’ বয়স দেখে মনে হচ্ছে ১০০ এর স্বনিকটে হবে। বৃদ্ধা আবার বললো, ‘‘বয়স হয়ে গেছে চোখে কম দেখি। কে গো তুমি মা?’’ পৃতি বললো, বলছি তার আগে বলেনতো ওই যে বাঁধানো ছবিতে দাড়িওয়ালা মানুষটি, কে ?
– ওর কথা বলিওনা। ও আমার ছেলে রকিবুল।
পৃতি যে দাড়ি ওয়ালা ছবি দেখে মানুষ টিকে চিনতে পারিনি এমন টি নয়। মানুষের যতই বয়স হোক যৌবনের কিছু আকৃতি কিন্তু মুখের মাঝে থেকে যায় যা আজীবন ভোলা যায়না। শুধু মনের ভ্রান্তি দূর করার জন্য প্রশ্নটি করা। পৃতি বললো, কেন আপনার, ছেলের কি সমস্যা?
– তার আগে বলত তুমি কে?
– আচ্ছা মা আমি বলছি। তার আগে বলুন আপনার ছেলে বিয়ে করেছে? বুড়ি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো ওই জন্য হয়ত আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। পৃতি নামের এক মেয়ে তাকে ও ভার্সিটি জীবনে বিয়ে করতে চেয়েছিলো। তার অপেক্ষায় এত দিন ও বিয়ে করেনি। ওর বাপটা ওই শোকেই মারা গেল। আল্লাহ যে কেন আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন?
– মা, যদি বলি আামি সেই মহিলা যার জন্য আপনার ছেলে এখনও বিয়ে করিনি।
বুড়ি অবাক নয়নে তাকিয়ে রইল। তারপর পৃতি তার জীবনে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা পূঙ্খানো পূঙ্খানু ভাবে রকির মা কে বলতে লাগলো। এর ভিতর কাজের মহিলা এটা এসে কখন নাস্তা দিয়ে গেছে তা কেউ বলতে পারেনা। কথা বলার এক পর্যায়ে বুড়িমা বললো, এই খালেদা আমার বৌমা আসছে নাস্তা নিয়ে আয়। ঘর হতে বাইরে এসে খালেদা বললো,আমি চাচির লাইগা সেই কখন নাস্তা দিয়া গেছি আপনারা কথা বলার মধ্যি ছিলেন তো এর লাইগা ট্যার পান নাই। পৃতি বললো,এই খালেদা তুমি কি আমারে চেন যে আমাকে চাচি বলে সাম্বোধন করলে? আপনারে চাচি কইলাম হ্যার লাইগা চাচার ঘরে ওয়ালের চারি পাশে যে মাইয়ার ছবি টাঙানো হ্যার চেহারা অনেকটা আপনার লাহান দেখতে। তয় আপনার এহন বয়স হইছে চোলে পাক ধরছে। পৃতি এবার উঠে দাঁড়ালো খুব উৎসুক ভাবে প্রশ্ন করলো তোমার চাচার রুম টা কই? খালেদা বললো,আমার লগে আহেন চাচি আম্মা। খালেদার সাথে পৃতি রকির রুমে প্রবেশ করলো। রকি রুমে প্রবেশ করার পরে পৃতি অবাক হয়ে গেল। রকির রুম টা দেখে মনে হল সে ছোট খাটো কোন এক মিউজিসিয়ামে প্রবেশ করেছে। রুমটা একে বারে পরিপাটি। রুমের চারিপাশ দিয়ে পৃতির ভার্সিটি লাইফের ছবি ঝুলানো। বেশি অবাক হল এই ছবি গুলো সে কিভাবে ম্যানেজ করলো। সে তো কোন দিন তাকে ছবি দেইনি। এমনটি তার বিয়ের আসরের ছবি ও এখানে ঝুলানো। সব ছবির নিচ দিয়ে রকির নিজের ছবি ঝুলানো। সেই ভার্সিটি লাইফ হতে আজ অবধী সব বয়সের ছবি। পৃতি মনের মাধূরী মিশিয়ে দেখতে থাকলো। চোখের পলক পড়ছে না। একটার পর একটা ছবিতে চোখ বুলাতে থাকলো । খালেদা বললো, চাচি এত দিন পরে আসলেন আগে নাস্তা কইরা লন। তার পরে দেইখেন। এত দিন পরে এলেন মানে? অবাক হয়ে বললো পৃতি। খালেদা বললো, হায় আল্লা! চাচি আপনি কন কি? এই বাসায় ৩ বছর ধইরা কাম করতাছি আপনার যৌবন কালের ছবি দেইখা আমি চাচারে জিগাইতাম চাচা এত সুন্দর চাচিরে আপনে কই হারাইছেন? চাচা আমারে কয়, কেডা কইছে তোর চাচিরে হারাইছি। তোর চাচি আমার জন্য বিদেশে গ্যাছে দেখিছ ও একদিন ফিইরা আইবো। আপনার ফেরত আইতে আইতে তিন বছর কাইটা গেল। পৃতি খালেদার কথা শুনে কিছুই বললো না। অনুভব করলো আসল ভালবাসা কাকে বলে। ভালবাসার শক্তি কত প্রখর যে একজন তার জীবন এভাবে শেষ করে দিতে পারে। পৃতির চোখ পড়লো একটা টেবিলের দিকে। তার পাশেই বইয়ের তাক। তাকে শত শত বই। দূর হতে একটা বই এর কাভারে পেজে তার ছবি চোখে পড়ল। রকির এই গভীর ভালবাসায় মনে পড়ে গেল রবি ঠাকুরে সেই বিখ্যাত পঙ্কিতি দুটি ।
আমি তোমাকে অসংখ্য ভাবে ভালবেসেছি,অসংস্য বার ভালবেসেছি,এক জীবনের পর অন্য জীবনে ও ভালবেসেছি,বছরের পর বছর সর্বদা সব সময়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পৃতি আস্তে আস্তে যেয়ে বইটি হাতে নিল। বই টির নাম‘শেষ বিকেলের মেঘ’ বই এর পিষ্ঠা গুলো উল্টায়ে পল্টায়ে দেখতে লাগলো। দেখা শেষ করে তাকের অন্যান্য বই গুলো নেড়ে চেড়ে দেখতে থাকলো। যে বইটি ধরে সব গুলো বই এর লেখক রকিবুল হাসান। এবং আরো একটি মজাদার ঘটনা। প্রতিটা বইয়ে কোন না কোন পেজে পৃতির ছবি আছেই। এক সময় খালেদা কে প্রশ্ন করলো খালেদা তোমার চাচা কি লেখক? খালেদা এক গাল হেসে কয় খালা আমার লগে ফাজলামি করেন না? চাচা দ্যাশের নাম করা কবি আর চাচি আমারে সমকরা কইরা জিগাই চাচা লেখক কিনা। ওই দিকে তাকিয়ে দ্যাখেন পুরস্কারের গাদা সব লিখে লিখে পাইছে চাচায়। পৃতি রুমের দক্ষিনে তাকিয়ে দেখলো অনেক বড় একটা কাচের শোকেস । পৃতি শোকেস টার পাশে গেল দেখলো সেখানে অনেক গুলো মেডেল ও ক্রেজ। পৃতির বুঝতে বাকি রইলো না। সে গুলো সাহিত্যের জন্য সেরা উপার্জন। এ এগুলো সে আপন হাতের পরম চোঁয়ায় পরগ করে করে দেখলো। পৃতি এবার চলে আসলো টেবিলটার কাছে। দেখলো টেবিলে অনেক গুলো ডায়েরী খাতা কলম সাজানো। হঠাৎ মনে পড়ে গেল। তার উপহার দেওয়ার সেই ডায়েরীর কথা সে এই ডায়েরী গুলোর ভিতর তার দেওয়া ডায়েরী খুঁজতে লাগলো। কিন্তু কোথাও খুঁজে পেলনা। খুব তিক্ষèভাবে মনে করতে থাকলো উপহার টুকু সে তো মলির কাছে দিয়েছিল। মলি তার কাছে না দিলেও দিতে পারে। এক দুপা করে খালেদার সাথে বাইরে আসলো। বললো দাও নাস্তা দাও। খুব ক্ষুধা পাইছে। খালেদা বললো চাচি আম্মা ভাত আছে ভাত দেই। প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এল এখন কেউ কি আর ভাত খায়। এখন নাস্তা রাতে ভাত খাবো। বললো পৃতি বেগম।
নাস্তা করতে করতে পরে বুড়ি মা কে শুধালো আম্মা রকি কোথায়? বুড়িমা বললো, ও সব সময় লেখা লিখি করে। নোবেল লেখে, বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালিখি করে। হয়ত সেখানে আছে। তবে খুব বেশি বাইরে থাকে না আমাকে রেখে । এক্ষনি চলে আসবে। এমন সময় দারোয়ান এসে দরজায় নক করলো । খালেদা এসে দরজা খুলে দিল। দারোয়ান থর থর কাঁপছে চোখ মুখ লাল হয়ে আছে। দারোয়ান খালেদা কে বললো, দাদি আম্মা কোনহানে? ওই তো ভিতরে। ক্যান কি হইছে বাইরে কিসের শব্দ হইতাছে বললো খালেদা। দারোয়ান বললো, পরে শুইনো তুই দাদি আম্মারে লইয়া একটু গ্যারেজে আয়। আর কোন কথা না বাড়িয়ে দারোয়ান নিচে চলে গেল। খালেদা বুড়িমা ও পৃতিকে নিয়ে গ্যারেজে আসলো। দেখলো অনেক গুলো মানুষ একটা লাসকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। বুড়িমা বললো তোমরা কাঁদছো কেন, ওটা কার লাস? এখানে যারা দাঁড়িয়ে আছে সবাই কবি সাহিত্যিক। সমাজের উঁচু মাথা। কিন্তু কেউ কোন কথা বলছে না। দারোয়ান হাউ হাউ করে কেঁদে বললো দাদি আম্মা এটা চাচার লাশ বিকাল তিনটার সময় নাকি চাচা ঢাকা লাইব্রেরিতে ষ্ট্রোক করে মারা গেছেন। বুড়ি মা ছেলের মুখটা বের করে মায়ের পাগলামী বিলাপ করতে লাগলো। কি অবাক বিষয় যে তিনটার সময় পৃতি রকির বাসায় প্রবেশ করলো সেই সময় রকি গত হলো। আহারে! পৃতি বিহবল হয়ে গেল অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে রকি মায়া ভরা সেই মুখের পানে। চেহারার উপর থেকে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার কয়েটা চয়ন যেন প্রতিধ্বনী হচ্ছে-
বিশ্বাস করুন আমি কবি হতে আসিনি,আমি নেতা হতে আসিনি,আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম,প্রেম পেতে এসেছিলাম,সে প্রেম পেলাম না বলে এই প্রেমহীন নীরস পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।
পৃতি বেগমের কোন ভাষা নেই । চোখে ও নেই কোন পানি। যেন নিষ্প্রান এক বস্তু দাঁড়িয়ে আছে। চোখে পানি থাকবে কি করে সে তো নিথর। কত কথা স্মৃতি পটে ভেসে উঠছে। কি হলো কেন হলো সব উত্তর তার জানা নেই। লাসের সৎগতি হল। কেটে গেল দুই দিন। বুড়িমা পৃতিকে বললো তুমি তোমার ছেলে মেয়ের কাছে ফিরে যাও। পৃতি বললো তা হয়না। এত দিন সে আপনাকে আগলে রেখেছিল আজ সে নেই। আমি গেলে আপনাকে দেখবে কে। বলে আস্তে আস্তে রকির রুমের দিকে প্রবেশ করলো। দেখলো তার নাক বরাবর আলমারির উপর কোরান শরীফ, তার পাশে একটা ডায়েরী। ডায়েরী হাতে নিল । হাতে নিতেই বুছতে পারলো তার দেওয়া ডায়েরী। ডায়েরীর কোন পেজ খালি নেই। সব গুলো পেজ লেখা। নজর পড়লো একে বারে শেষের পিষ্ঠায়। সেখানে লেখা..
পৃতি, কেন জানি মনে হয় তুমি আমার জন্য এক সময় না এক সময় চলে আসবে। কিন্তু আমার সাথে তোমার দেখা হবে না। সেই ভাবনা হতে একটা উপন্যাস লিখেছি। উপন্যাসের নাম “শেষ বিকেলের মেঘ।” আর এই শেষ বিকেলে মেঘ আমি। যদি হঠাৎ দমকা হাওয়া আসে যেখানে আধার জমে গেছে সেখানে চলে যাব। আর সূর্য ডুবলেই তো আমি নিরুদ্দেশ। অবাক হবে! এই উপন্যাস টি লিখে আমি একুশে পদক পুরস্কার পেয়েছি। বই টি পড়। ইতি রকি।।

শেষ বিকেলের মেঘ

মৃত্যুঞ্জয় সরদার উচ্ছ্বাস

5,266 total views, 2 views today

Related Posts

Share

Comments

comments

রিপোর্টার সম্পর্কে

%d bloggers like this: